যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতির আভাস, হাউস পুনর্দখলের পথে দলটি; সিনেটেও বাড়ছে জয়ের সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন। আগামী ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার দেশজুড়ে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ আগামী দুই বছর কার হাতে থাকবে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে প্রকাশিত জনমত জরিপ ও নির্বাচনী পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পক্ষে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশ শক্তিশালী। অন্যদিকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও রিপাবলিকানদের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের কঠিন লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাট ও তাঁদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলা স্বতন্ত্র সদস্যদের আসন ৪৭টি। অন্যদিকে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সংকীর্ণ। ফলে কয়েকটি আসনের পরিবর্তনেই কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যেতে পারে। এবারের নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসন এবং হাউসের সব ৪৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জাতীয় পর্যায়ের জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা স্পষ্ট। পোলিং ফোরকাস্টের ১ নভেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ের হাউস ভোটের সম্ভাব্য হিসাবে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে প্রায় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে অন পয়েন্ট পলিটিকসের ১ নভেম্বর হালনাগাদ করা ৩৬৪টি জনমত জরিপের গড় হিসাবে ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান ১২ শতাংশ পয়েন্ট। এই দুই প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি ও জরিপের নমুনা এক নয়। তবে উভয় হিসাবেই ডেমোক্র্যাটদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।
পোলিং ফোরকাস্টের নির্বাচনী মডেল অনুযায়ী, হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা ৯১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য আসন ২৪৩টি এবং রিপাবলিকানদের ১৯২টি। অন্যদিকে অন পয়েন্ট পলিটিকসের ২ হাজার নির্বাচনী সিমুলেশনের পূর্বাভাসে হাউসে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা ৯৮ শতাংশ এবং সম্ভাব্য আসন ২৫১টি। দুই প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে আসনসংখ্যার পার্থক্য থাকলেও মূল প্রবণতা একই—হাউসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সিনেটের লড়াই তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত ৫১টি আসন নিশ্চিত করতে হবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিনেটে সমান ভোট হলে সিদ্ধান্তমূলক ভোট দিতে পারেন। সে কারণে ৫০-৫০ আসন হলেও রিপাবলিকানরা কার্যত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন। বর্তমান ৫৩-৪৭ অবস্থান থেকে ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে। এ কারণেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন এবারের সিনেট নিয়ন্ত্রণের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
সিনেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, মিশিগান, ওহাইও ও টেক্সাস। ওয়াশিংটন পোস্টের উচ্চমানের জরিপগুলোর গড় বিশ্লেষণে এই সাতটি রাজ্যের প্রতিটিতেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া গেছে। তবে অধিকাংশ লড়াইয়ের ব্যবধান জরিপের ত্রুটিসীমার মধ্যে। ফলে শেষ পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি, অনির্ধারিত ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচনী দিনের পরিস্থিতি ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক ইউগভ জরিপেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের অগ্রগতি দেখা গেছে। কানসাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে ৫০ শতাংশের বিপরীতে ৪৯ শতাংশ সমর্থনে এগিয়ে রয়েছেন। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে ৫১-৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে। মেইনে ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের বিরুদ্ধে ৫২-৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদ মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে ৫১-৪৭ এবং ওহাইওতে শেরড ব্রাউন জন হাস্টেডের বিরুদ্ধে ৫০-৪৮ ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। আইওয়ায় জশ টুরেক রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনের বিরুদ্ধে ৫০-৪৯ ব্যবধানে এগিয়ে। তবে নেব্রাস্কায় রিপাবলিকান পিট রিকেটস ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ড্যান ওসবর্নের মধ্যে জরিপে ৪৯-৪৯ সমতা দেখা গেছে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পোলিং ফোরকাস্ট ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা ৮৬ শতাংশ হিসেবে দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাসে দলটির সম্ভাব্য আসন ৫৩টি। অন পয়েন্ট পলিটিকসের নির্বাচনী সিমুলেশনে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা ৮৮ শতাংশ এবং সম্ভাব্য আসন গড়ে প্রায় ৫৫টি। তবে এই পূর্বাভাসগুলো নিশ্চিত ফল নয়; এগুলো জরিপ, ঐতিহাসিক ভোটের প্রবণতা, প্রার্থীদের অবস্থান এবং নির্বাচনী মানচিত্রের ভিত্তিতে তৈরি সম্ভাব্য হিসাব।
এবারের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, অভিবাসননীতি এবং ইরান যুদ্ধের মতো বিষয় ভোটারদের আলোচনায় রয়েছে। পোলিং ফোরকাস্টের বিশ্লেষণে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার প্রায় ৩৭ শতাংশ এবং অসন্তুষ্টির হার প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কম থাকলে সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল সুবিধা পায়। এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে তৈরি হওয়া জনমত সেই ঐতিহাসিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে স্বতন্ত্র পরিচয়ধারীদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আল জাজিরার ২ নভেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক ভোটার নিজেদের ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান পরিচয়ের বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে তাঁদের বড় অংশ ভোট দেওয়ার সময় দুই প্রধান দলের একটির প্রতি ঝোঁক প্রকাশ করেন। বিশেষ করে শহরতলি, তরুণ ভোটার এবং রাজনৈতিকভাবে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের সিদ্ধান্ত হাউস ও সিনেটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে ফল নির্ধারণ করতে পারে।
রিপাবলিকানদের জন্য এবারের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াই নয়, বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নও। দলটি উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে বাজেট, করনীতি, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি ব্যয় এবং প্রশাসনের বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে পারে। কংগ্রেসের কমিটিগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও নজরদারি জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা হাউসের পাশাপাশি সিনেটের নিয়ন্ত্রণও পেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে সিনেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোর অনেকগুলোই ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। সে কারণে জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকা মানেই সিনেটের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় নিশ্চিত—এমনটি বলা যাচ্ছে না। স্থানীয় প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, নির্বাচনী প্রচারণার অর্থায়ন এবং অঙ্গরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতা এখানে বড় ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগের শেষ পর্যায়ের জরিপ ও পূর্বাভাসে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস পুনর্দখলের দৌড়ে ডেমোক্র্যাটরা স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছেন। সিনেটের ক্ষেত্রেও তাঁদের জয়ের সম্ভাবনা বেড়েছে, যদিও সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি অনিশ্চিত। আগামী ৩ নভেম্বরের ভোটে কোন দল শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কংগ্রেসনাল জেলার ফলাফলের ওপর। নির্বাচনের ফল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, আগামী দুই বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের ক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণের গতিপথও নির্ধারণ করবে।