অরুণাচল সীমান্তে চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ, ফের উত্তপ্ত ভারত–চীন সম্পর্ক
নিউজ ডেস্ক: অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) কথিত অনুপ্রবেশ ও সামরিক স্থাপনা তৈরির অভিযোগকে ঘিরে ভারত–চীন সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অরুণাচলে চীনা বাহিনীর সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশ বা ভারতীয় ভূখণ্ডে ক্যাম্প স্থাপনের খবর “ভুল এবং ভিত্তিহীন”।
সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি জেলার তাখসিং এলাকার স্থানীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (NWS) অভিযোগ করে, সীমান্তের কয়েকটি এলাকায় চীনা বাহিনীর উপস্থিতি বেড়েছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত কিছু জমিতে চীনা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংগঠনটি ওইং, পানিয়ার, মারপান, পোত্রাং লেক ও টিংডিংটাংসহ কয়েকটি এলাকার কথা উল্লেখ করে।
অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অরুণাচল প্রদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মামা নাটুং প্রথমদিকে অভিযোগগুলো তদন্তের কথা জানান। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেই বলেন, তাখসিং এলাকায় চীনা বাহিনীর ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব খবরকে তিনি গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
সীমান্তে চীনের অবকাঠামো নিয়ে ভারতের উদ্বেগ
যদিও সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশের অভিযোগ ভারতীয় সেনাবাহিনী নাকচ করেছে, চীন–ভারত সীমান্তে অবকাঠামোগত প্রতিযোগিতা বাস্তব। ২০২৬ সালের মার্চে ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, চীন তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সীমান্তজুড়ে ৬২৮টি ‘শিয়াওকাং’ সীমান্ত গ্রাম নির্মাণ করেছে। এসব গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ অরুণাচল প্রদেশের মুখোমুখি এলাকায় রয়েছে বলে জানানো হয়। ভারতের নিরাপত্তা মহলে এসব স্থাপনার সম্ভাব্য দ্বৈত—বেসামরিক ও কৌশলগত—ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতও সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন জোরদার করছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অরুণাচলসহ উত্তর সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে সীমান্ত গ্রামের উন্নয়ন, সড়ক ও সেতু নির্মাণের জন্য ‘ভাইব্র্যান্ট ভিলেজেস’ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
অরুণাচল নিয়ে চীনের দাবি
অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ভারত ও চীনের ভূখণ্ডগত বিরোধ বহু পুরোনো। বেইজিং অরুণাচলকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ হিসেবে দাবি করে। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও চীন অরুণাচল প্রদেশের বেশ কয়েকটি স্থানের জন্য নতুন চীনা নাম ঘোষণা করে।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই পদক্ষেপ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানায়, চীনের দেওয়া কাল্পনিক নাম বা নতুন দাবি বাস্তব ভূখণ্ডগত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে না এবং অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উত্তেজনা কমলেও সীমান্ত বিরোধ রয়ে গেছে
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত–চীন সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টেও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে চীনও সীমান্ত পরিস্থিতিকে মোটামুটি স্থিতিশীল বলে উল্লেখ করেছে।
শেষ কথা
অরুণাচলে চীনের নতুন করে ‘ভূমি দখল’ হয়েছে—এমন দাবি সামাজিক ও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিলেও এ মুহূর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও অরুণাচল সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী এই অভিযোগ নিশ্চিত নয়। তবে চীনের সীমান্ত অবকাঠামো, অরুণাচল নিয়ে ধারাবাহিক ভূখণ্ডগত দাবি এবং পাল্টা ভারতীয় অবকাঠামো উন্নয়ন—সব মিলিয়ে হিমালয় সীমান্তে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা যে এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট।