Columbus, ০১ অক্টোবর, ২০২৬
বিজ্ঞাপন 728 × 90
সর্বশেষ খবর
জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডে বিজিবির ভূমিকা নিয়ে নেত্র নিউজের অনুসন্ধান: কমান্ড পর্যায়ের দায় নিয়ে নতুন প্রশ্ন কুড়িগ্রামে জেলা প্রশাসক গোল্ডকার্প ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন মুছাপুর ক্লোজার: উপকূলীয় জনপদ রক্ষা ও কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কোম্পানীগঞ্জে অক্সফোর্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নওগাঁয় খ্রিস্টান ধর্ম ছেড়ে একই পরিবারের ৫ জনের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার অবৈধ মশারি ও রিং জাল ধ্বংস করা হয়েছে নানিয়ারচরে মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা, অনলাইন জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা ২০২৮ সালে আসছে নতুন মার্কিন পাসপোর্ট: ‘Flight of the Eagle’ নকশায় বড় পরিবর্তন আড়াই লাখের বেশি মার্কিন ভিসা বাতিল: অপরাধ, ভিসার শর্ত ভঙ্গ ও অভিবাসনব্যবস্থা অপব্যবহারের অভিযোগে ব্যাপক অভিযান সেনবাগে আবুল খায়ের মোল্লার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন মাদ্রাসা ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টার অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার নাসিরনগরে ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ এর শুভ উদ্বোধন আসন না পেলেও কুড়িগ্রামকে অবহেলা করা হবে না: ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এমপি কুড়িগ্রামে পিপিআর রোগের বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার জের: স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলেন এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
হোম › বিশেষ প্রতিবেদন › জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডে বিজিবির ভূমিকা নিয়ে নেত্র নিউজের অনুসন্ধান: কমান্ড পর্যায়ের দায় নিয়ে নতুন প্রশ্ন

জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডে বিজিবির ভূমিকা নিয়ে নেত্র নিউজের অনুসন্ধান: কমান্ড পর্যায়ের দায় নিয়ে নতুন প্রশ্ন

নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৬:২২ পিএম, ০১ অক্টোবর, ২০২৬ 43
জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডে বিজিবির ভূমিকা নিয়ে নেত্র নিউজের অনুসন্ধান: কমান্ড পর্যায়ের দায় নিয়ে নতুন প্রশ্ন

মো: নাজমুল হাসান বাবু॥


২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজ। তাদের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বা বিজিবির মোতায়েন, গুলিবর্ষণ, মাঠপর্যায়ের অভিযান এবং বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ড কাঠামোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে রামপুরা-বনশ্রী, নরসিংদী ও সিলেটের গোলাপগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিজিবি সদস্যদের গুলিবর্ষণের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ও ছবির বিশ্লেষণ এবং নিহতদের পরিবারের সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছে। নেত্র নিউজের অনুসন্ধানটি একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গেও বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখেছে।


নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের একটি তালিকা নিয়ে নিহতদের পরিবারের সাক্ষাৎকার, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ওপেন সোর্স তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা অন্তত ৭০৫ জনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হামলার তথ্য পেয়েছে। তাদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, অন্তত ৮৬টি হত্যাকাণ্ডে বিজিবি সদস্যরা এককভাবে অথবা পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে অংশ নিয়েছিলেন বলে প্রমাণ বা তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এগুলো নেত্র নিউজের নিজস্ব অনুসন্ধানের ফলাফল; এগুলোকে আদালতের চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।


জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের আন্দোলন দমনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে কয়েকশ মানুষের নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা পেতে বাধা দেওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘের তদন্ত দল ২৩০টি সাক্ষাৎকার, চিকিৎসা নথি এবং বিপুল পরিমাণ অডিওভিজ্যুয়াল উপাদান বিশ্লেষণ করে তাদের অনুসন্ধান তৈরি করেছিল।


নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ১৯ জুলাই ২০২৪-এর রামপুরা-বনশ্রী এলাকার ঘটনা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ জুলাই রামপুরার বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের নিরাপত্তায় বিজিবির কয়েকটি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হয়। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল রকিবুল হাসান, মেজর রাফাত বিন আলম মুন এবং ২৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথমদিকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল রকিবুল হাসানের নেতৃত্বে বিজিবির সদস্যরা বিটিভি এলাকায় অবস্থান নেন। পরে মেজর মুনের নেতৃত্বে আরও সদস্য রামপুরা এলাকায় আসে। এর পরপরই বিভিন্ন স্থানে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে নেত্র নিউজ জানিয়েছে।


১৯ জুলাই দুপুরে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী রামপুরার বিটিভি ভবনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। নেত্র নিউজের প্রকাশিত ভিডিও ও প্রতিবেদনে তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তিনি আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুনরুদ্ধারে বিজিবি অভিযান পরিচালনা করেছে। তিনি আরও বলেন, বিজিবির সদস্যদের মনোবল জোগানো এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি সেখানে গিয়েছেন।


এই বক্তব্যকে অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখিয়েছে নেত্র নিউজ। তাদের প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ে বিজিবি সদস্যদের অভিযান ও গুলিবর্ষণের সময় বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কমান্ড কাঠামো কী ভূমিকা পালন করেছিল এবং মহাপরিচালক মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে কতটা অবহিত ছিলেন।


নেত্র নিউজের হাতে থাকা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই বিটিভি ভবনে বিজিবির মহাপরিচালককে ২৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। একই দিন সন্ধ্যায় বনশ্রী এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় কয়েকজন নিহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে মিজানুর রহমান এবং ১৪ বছর বয়সী আশিকুল ইসলামের মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


নিহতদের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ার অভিযোগও ছিল। রামপুরার ডেল্টা হাসপাতালের একজন চিকিৎসক ও নিরাপত্তাকর্মীর বক্তব্যের ভিত্তিতে নেত্র নিউজ দাবি করেছে, হাসপাতালের কাছাকাছি গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে গেলে গুলিবর্ষণের কারণে তারা তাকে ভেতরে নিতে পারেননি। পরে তার মরদেহ হাসপাতালের সিঁড়িতে পড়ে ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।


রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় গুলির চিহ্ন নিয়েও অনুসন্ধান করা হয়েছে। নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বিভিন্ন স্থাপনা, টেলিফোন ডিস্ট্রিবিউশন ক্যাবিনেট ও লোহার গেটে গুলির চিহ্ন দেখানো হয়েছে। একজন আহত ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, একটি গুলি টেলিফোন ক্যাবিনেট ভেদ করে তার মুখে আঘাত করে এবং এতে তার দাঁত ভেঙে যায়। এসব দৃশ্য ও সাক্ষ্য ব্যবহার করে প্রতিবেদনে ওই এলাকার গুলিবর্ষণের ব্যাপকতা তুলে ধরা হয়েছে।


প্রতিবেদনে ১০ বছর বয়সী তামিম শিকদারের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুযায়ী, বনশ্রী এলাকায় গুলির মধ্যে শিশুটি আহত হয় এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যায়। একই এলাকার আরও কয়েকজন নিহত ও আহত ব্যক্তির পরিবারের বক্তব্যও অনুসন্ধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


রামপুরার বাইরে নরসিংদীর ঘটনাও অনুসন্ধানে গুরুত্ব পেয়েছে। নেত্র নিউজের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনায় নরসিংদী জেলায় নিহত ১৭ জনের মধ্যে সাতজন বিজিবি অথবা বিজিবি-পুলিশের যৌথ অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন বলে তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ড্রিম হলিডে পার্ক এলাকায় বিজিবির অস্থায়ী ক্যাম্প এবং মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় তাদের টহল ও গুলিবর্ষণের বিষয়ে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।


সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। সেখানে ৪ আগস্ট বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানে কয়েকজন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নেত্র নিউজ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বিজিবি সদস্যদের হাতে Type 56 ধরনের রাইফেল থাকার দাবি করেছে এবং প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যে গুলিবর্ষণের বিবরণ তুলে ধরেছে। তবে অস্ত্র শনাক্তকরণ ও নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে থাকা অস্ত্রের বিষয়ে যেসব দাবি করা হয়েছে, সেগুলো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।


বিজিবির কমান্ড কাঠামোর প্রসঙ্গে অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো ১৮ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত কোর কমিটির বৈঠক। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে এই কমিটির বৈঠক এবং নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। নেত্র নিউজও তাদের অনুসন্ধানে ওই বৈঠকের নথি এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য ব্যবহার করেছে।


জাতিসংঘের অনুসন্ধান অনুযায়ী, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বৈঠকে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছিলেন। নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর ওই কমিটির সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেত্র নিউজ দাবি করেছে, ১৮ জুলাইয়ের বৈঠকে বিজিবিকে আরও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা এবং কমান্ড কাঠামো নিয়ে গুরুতর পর্যবেক্ষণ থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অপরাধী হিসেবে চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ আদালতের কাজ। জাতিসংঘ নিজেও তাদের অনুসন্ধানকে জবাবদিহি ও ভবিষ্যৎ বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে।


নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই রামপুরা-বনশ্রী-বাড্ডা এলাকায় বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানে অন্তত ৩৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য তারা পেয়েছে। তাদের বিশ্লেষণে একজন ছাড়া অন্যদের মৃত্যু বিজিবির গুলির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করা হয়েছে। এ ধরনের সংখ্যাগত ও দায়-সম্পর্কিত তথ্য নেত্র নিউজের নিজস্ব ডেটা বিশ্লেষণের ফল এবং পৃথক বিচারিক রায়ের মাধ্যমে প্রতিটি মৃত্যুর দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।


বিজিবির মহাপরিচালকের বর্তমান ভূমিকা নিয়েও অনুসন্ধানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জুলাইয়ের দমন অভিযানের সময় বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে পদ হারিয়েছেন, কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বা তারা আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে কমান্ড পর্যায়ের সম্ভাব্য দায় নিয়ে তদন্তের প্রশ্নটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


তবে এ বিষয়ে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও প্রশ্ন তোলা হয়েছে; একই সঙ্গে প্রতিবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্যও রয়েছে যে তদন্ত এখনো সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি এবং নতুন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তা তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। ফলে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।


২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান অবশ্য নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে ব্যাপক তথ্য দিয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে, তাদের তদন্তে নিহত ও আহতদের বিষয়ে সাক্ষাৎকার, চিকিৎসা নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং হাজার হাজার অডিওভিজ্যুয়াল উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্রের পাশাপাশি হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে।


অন্যদিকে, নেত্র নিউজের নতুন অনুসন্ধান মূলত সেই বৃহত্তর ঘটনার ভেতরে বিজিবির ভূমিকা, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম এবং বাহিনীর কমান্ড পর্যায়ের সম্ভাব্য দায়কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। ফলে অনুসন্ধানটির মূল প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে—মাঠপর্যায়ে যারা গুলি চালিয়েছিল, তাদের পাশাপাশি সেই অভিযানের পরিকল্পনা, নির্দেশনা, অনুমোদন এবং তদারকির সঙ্গে যুক্ত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায় কীভাবে নির্ধারণ করা হবে।


২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়া এখনও চলমান। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চলমান ও ভবিষ্যৎ তদন্তে এর তথ্য বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে বলে জাতিসংঘের পরবর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


ফলে নেত্র নিউজের অনুসন্ধান প্রকাশের পর নতুন করে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা শুধু মাঠপর্যায়ে গুলি চালানো ব্যক্তিদের দায় নিয়ে নয়; বরং একটি বৃহৎ নিরাপত্তা অভিযানের ক্ষেত্রে নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী, তদারককারী এবং মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের মধ্যে দায়ের সীমারেখা কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটিও এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।


তথ্যসূত্র: নেত্র নিউজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘The Guns of July’; নেত্র নিউজের ‘Counting the Monsoon Massacre’; জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ২০২৪ সালের Preliminary Analysis এবং ২০২৫ সালের Fact-Finding Report; The Daily Star ও Tech Global Institute-এর রামপুরা-সংক্রান্ত যৌথ অনুসন্ধান।