৩৫০ রানের ইতিহাস, তামিমের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় তাওহীদ হৃদয়
স্পোর্টস ডেস্ক ||
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম প্রথম-শ্রেণির ট্রিপল সেঞ্চুরি; ৪৮১ বলে অপরাজিত ৩৫০
দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে ব্যাট হাতে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছেন তাওহীদ হৃদয়। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অধিনায়ক দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’-এর বিপক্ষে দ্বিতীয় চার দিনের আনঅফিশিয়াল টেস্টের শেষ দিনে অপরাজিত ৩৫০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
হৃদয়ের ৩৫০ রানের ইনিংসটি এসেছে ৪৮১ বল মোকাবিলা করে। দীর্ঘ এই ম্যারাথন ইনিংসে তিনি ২৭টি চার ও ১০টি ছক্কা মেরেছেন। আগের দিন ২০৪ রানে অপরাজিত থেকে শেষ দিনের খেলা শুরু করা হৃদয় ধৈর্য, আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ও অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতার সমন্বয়ে নিজের ইনিংসকে নিয়ে যান ৩৫০ রানে।
তামিমের ছয় বছরের রেকর্ড ভাঙলেন হৃদয়
হৃদয়ের ঐতিহাসিক ইনিংসের আগে বাংলাদেশের প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড ছিল তামিম ইকবালের দখলে। তামিম ২০২০ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে ইস্ট জোনের হয়ে সেন্ট্রাল জোনের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৩৪ রান করেছিলেন।
হৃদয় সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন ১৬ রান। তাঁর ৩৫০* এখন বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। এর আগে রেকর্ডটি দীর্ঘ সময় ধরে তামিমের দখলে ছিল।
বাংলাদেশের প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে ৩০০ বা তার বেশি রানের ইনিংসও খুবই বিরল। হৃদয়ের আগে মাত্র দুজন বাংলাদেশি ব্যাটার এই কীর্তি গড়েছিলেন—রকিবুল হাসান ৩১৩* এবং তামিম ইকবাল ৩৩৪*। ফলে হৃদয় হলেন দেশের ইতিহাসে তৃতীয় ব্যাটার, যিনি প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছেন।
বিদেশের মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ান
হৃদয়ের ৩৫০ রানের কীর্তির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দিকগুলোর একটি হলো—তিনি বিদেশের মাটিতে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার।
এর আগে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে তিন শতাধিক রানের ইনিংসগুলো দেশের মাটিতেই এসেছিল। এবার দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে সেই ইতিহাস বদলে দিলেন হৃদয়।
শুধু তাই নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে কোনো বিদেশি ব্যাটারের সর্বোচ্চ প্রথম-শ্রেণির স্কোরের রেকর্ডও এখন হৃদয়ের দখলে। তাঁর ৩৫০ রানের ইনিংসটি ১৯৪৮ সালে ইংল্যান্ডের ডেনিস কম্পটনের করা ৩০০ রানের আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
৩৭ রানে ২ উইকেট থেকে শুরু, শেষ ৬৭৬/৮
হৃদয়ের ইনিংসটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় দলের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে। ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ ‘এ’ দল শুরুতেই চাপে পড়ে। দলীয় ৩৭ রানের মধ্যেই দুই উইকেট হারানোর পর চার নম্বরে নেমে ইনিংসের হাল ধরেন হৃদয়।
একপর্যায়ে দলের একাধিক ব্যাটার ফিরে গেলেও তিনি এক প্রান্ত আগলে রাখেন। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহের পথে নিয়ে যান। সাইফউদ্দিন করেন ৮৭ রান। পরে লোয়ার অর্ডারের রেজাউর রহমানও হৃদয়কে দারুণভাবে সঙ্গ দেন এবং ১১০ বলে অপরাজিত ৩১ রান করেন।
শেষ পর্যন্ত হৃদয়ের অপরাজিত ৩৫০ রানের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ‘এ’ প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে ৮ উইকেটে ৬৭৬ রানে।
১৬৪ রানের লিড, শেষ পর্যন্ত ড্র
এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ তাদের প্রথম ইনিংসে ৫১২ রান করেছিল। ফলে বাংলাদেশ ‘এ’ ৬৭৬ রান করে ইনিংস ঘোষণা করলে ১৬৪ রানের লিড পায়।
তবে ম্যাচের শেষ দিনে সময় খুব বেশি অবশিষ্ট না থাকায় দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’-কে দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুত অলআউট করার বাস্তবসম্মত সুযোগ ছিল না বাংলাদেশের। স্বাগতিকরা দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮ রান তুলতেই দুই দলের মধ্যে ম্যাচ ড্র মেনে নেওয়া হয়।
অর্থাৎ দলীয়ভাবে ম্যাচটি জয় দিয়ে শেষ করতে না পারলেও হৃদয়ের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য হয়ে থাকল অসাধারণ এক অর্জন।
রেকর্ডের তালিকায় হৃদয়ের ৩৫০*
তাওহীদ হৃদয়ের এই ইনিংসের মাধ্যমে একসঙ্গে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড যুক্ত হয়েছে তাঁর নামের পাশে—
* বাংলাদেশের প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর: ৩৫০*
* প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে ৩৫০ রান
* বিদেশের মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে প্রথম-শ্রেণির ট্রিপল সেঞ্চুরি
* দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে কোনো বিদেশি ব্যাটারের সর্বোচ্চ প্রথম-শ্রেণির স্কোর
* বাংলাদেশের তৃতীয় ব্যাটার হিসেবে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি
* ৪৮১ বলে ৩৫০*, সঙ্গে ২৭টি চার ও ১০টি ছক্কা
তামিমের রেকর্ড ভাঙার পর নতুন আলোচনায় হৃদয়
সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পরিচিত তাওহীদ হৃদয়ের জন্য এই ইনিংসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ ফরম্যাটে এত বড় ইনিংস খেলার মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিলেন, প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকে ইনিংস গড়ে তোলার সামর্থ্যও তাঁর রয়েছে।
বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কন্ডিশনে ৪৮১ বল খেলে অপরাজিত ৩৫০ রান করা তাঁর ব্যাটিং সক্ষমতার নতুন একটি দিক সামনে এনেছে। তাঁর ইনিংসটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রথম-শ্রেণির পর্যায়ে ব্যাটিংয়ের নতুন মানদণ্ডও তৈরি করেছে।
তামিম ইকবালের রেকর্ড ভেঙে হৃদয় এখন শুধু নতুন রেকর্ডের মালিক নন; তাঁর ৩৫০* বাংলাদেশের প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেট ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকল।