ঘরোয়া ক্রিকেটারদের জন্য সুখবর, দ্বিগুণ হলো ম্যাচ ফি
স্পোর্টস ডেস্ক ||
প্রথম শ্রেণি, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—সব সংস্করণেই বড় পারিশ্রমিক বৃদ্ধি; বছরে ৩০–৪০ লাখ টাকা আয়ের সুযোগ
দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাদার ক্রিকেট কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের পারিশ্রমিক বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ঘরোয়া ক্রিকেটের বিভিন্ন সংস্করণে ম্যাচ ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচ ফি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ওয়ানডে বা লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ১ লাখ টাকা এবং টি-টোয়েন্টিতে ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মিরপুরে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। ক্রিকেটারদের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনার পরই ম্যাচ ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচ ফি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুরুষদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রতি ম্যাচের ম্যাচ ফি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এর আগে ম্যাচপ্রতি এই ফি ছিল ৭০ হাজার টাকা।
তামিম ইকবাল বিসিবির অ্যাডহক কমিটির দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের এপ্রিলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ম্যাচ ফি বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করেছিলেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেটি আবার বাড়িয়ে দেড় লাখ টাকা করা হলো।
জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) মতো প্রথম শ্রেণির প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নেওয়া ক্রিকেটারদের জন্য এই বৃদ্ধি ঘরোয়া ক্রিকেটে আয়ের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনবে।
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতেও দ্বিগুণের কাছাকাছি বৃদ্ধি
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ম্যাচ ফি ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই সংস্করণে ম্যাচ ফি সরাসরি দ্বিগুণ হয়েছে।
অন্যদিকে ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ম্যাচ ফি ৪০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
ফলে প্রথম শ্রেণি, লিস্ট ‘এ’ এবং টি-টোয়েন্টি—তিন সংস্করণেই ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ম্যাচভিত্তিক আয়ের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নারী ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফিও বাড়ছে
বিসিবির নতুন কাঠামোর আওতায় নারী ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফিও বাড়ানো হয়েছে।
নারীদের চার দিনের ম্যাচে ম্যাচ ফি ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা, ওয়ানডেতে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং টি-টোয়েন্টিতে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
অর্থাৎ নারী ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই ম্যাচ ফি দ্বিগুণ করা হয়েছে।
বিপিএল স্থগিতের প্রভাবও বিবেচনায়
এবারের সিদ্ধান্তের সময় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) স্থগিত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিপিএল না হওয়ায় অনেক স্থানীয় ক্রিকেটারের সম্ভাব্য আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
তবে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বলেছেন, ম্যাচ ফি বাড়ানোকে শুধু বিপিএল না হওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্য হলো ঘরোয়া ক্রিকেটারদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই আর্থিক কাঠামো তৈরি করা, যাতে তারা শুধু জাতীয় দলের সুযোগ বা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ওপর নির্ভরশীল না থাকেন।
তামিমের মতে, নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশ নেওয়া একজন ক্রিকেটারের বছরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই আয় নির্ভর করবে তিনি কতগুলো প্রতিযোগিতা ও ম্যাচে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন তার ওপর।
ক্রিকেটারদের পেশাদারত্বের ওপরও জোর
পারিশ্রমিক বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রিকেটারদের কাছ থেকেও আরও বেশি পেশাদার আচরণ প্রত্যাশা করেছে বিসিবি। বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফিটনেস, প্রস্তুতি ও ম্যাচ খেলার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বিসিবি সভাপতি।
বিসিবির যুক্তি, ঘরোয়া ক্রিকেটে আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি খেলোয়াড়দের পেশাদার মানসিকতা ও দায়িত্ববোধও বাড়াতে হবে। এতে প্রতিযোগিতার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় দলের জন্য আরও শক্তিশালী খেলোয়াড় তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়বে।
শুধু ক্রিকেটার নয়, সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের পারিশ্রমিকও পর্যালোচনা
ঘরোয়া ক্রিকেটের আর্থিক কাঠামো সংস্কারের অংশ হিসেবে শুধু ক্রিকেটারদের নয়, আম্পায়ার, কোচ, স্কোরার, ট্রেনার, ফিজিওথেরাপিস্টসহ ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য পেশাজীবীর বেতন ও সম্মানীও পর্যালোচনা করছে বিসিবি।
তামিম ইকবাল জানিয়েছেন, এসব পেশার জন্য একটি মানসম্মত পারিশ্রমিক কাঠামো নির্ধারণের কাজ চলছে। ফলে ঘরোয়া ক্রিকেটের সামগ্রিক অবকাঠামোকে আরও পেশাদার করার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই বর্তমান সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ভিন্নতা
বিসিবির ঘোষিত নতুন ম্যাচ ফি কাঠামো মূলত বোর্ড পরিচালিত ঘরোয়া প্রতিযোগিতাগুলোর জন্য। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট এই বৃদ্ধির আওতার বাইরে থাকবে।
ফলে জাতীয় পর্যায়ের বোর্ড পরিচালিত প্রতিযোগিতাগুলোতে ম্যাচ ফি বাড়লেও ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের পারিশ্রমিক কাঠামো আলাদাভাবে বিবেচিত হবে।
ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরেই ঘরোয়া পর্যায়ের ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা ছিল। চলতি বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন বিসিবি ঘরোয়া ক্রিকেটারদের বেতন ও ম্যাচ ফি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। এবার দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের ম্যাচ ফি বৃদ্ধির ফলে সেই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলো।
বিসিবির আশা, নিয়মিত প্রতিযোগিতা, উন্নত পারিশ্রমিক ও পেশাদার পরিবেশ তৈরি হলে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের আগ্রহ ও প্রতিযোগিতার মান দুটোই বাড়বে। একই সঙ্গে তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য ক্রিকেটকে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগও আরও শক্তিশালী হতে পারে।