প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ
শিক্ষা ডেস্ক ||
শিক্ষক সংকট কমিয়ে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করার লক্ষ্য; নতুন কারিকুলামে ‘স্পিকিং টেস্ট’ চালুর পরিকল্পনা
ঢাকা: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট কাটাতে আগামী এক বছরের মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষার্থীদের শুধু লিখিত পরীক্ষার ফল নয়, তাদের যোগাযোগ দক্ষতা, বাস্তবজ্ঞান ও আত্মবিশ্বাসও মূল্যায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) যশোরের পিটিআই অডিটরিয়ামে আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এসব কথা জানান। ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহি ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি পরিবর্তিত প্রত্যাশা’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গেও বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।
আগামী এক বছরে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষক নিয়োগ
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট দূর করতে আগামী এক বছরের মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম আরও কার্যকর করা এবং প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিন ধরে পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর চাপ তৈরি করে আসছে। এ অবস্থায় নতুন শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ভারসাম্য উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তবে শুধু শিক্ষক বা অবকাঠামো বাড়ালেই হবে না; শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে কী শিখছে, সেটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পর শূন্য হবে সহকারী শিক্ষকের পদ
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে প্রায় ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে। এসব পদে পদোন্নতির ফলে যে সহকারী শিক্ষকের পদগুলো শূন্য হবে, তার মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি পদ আগামী বছরের মধ্যে পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আগে থেকে আটকে থাকা প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে অক্টোবর থেকে তাদের পদায়ন শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। এসব শিক্ষককে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) দুই মাসের ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে সরাসরি পাঠদানের দায়িত্ব না দেওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন প্রতিমন্ত্রী।
শুধু লিখিত পরীক্ষা নয়, গুরুত্ব পাবে যোগাযোগ দক্ষতা
প্রাথমিক শিক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পরিকল্পনা হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্পিকিং টেস্ট’ চালুর কথা জানিয়েছেন ববি হাজ্জাজ।
নতুন প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলামের আওতায় ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কতটা স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে এবং অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে—তা মূল্যায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মাধ্যমে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগ, নিজের কথা প্রকাশ এবং আত্মবিশ্বাসের মতো দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা এমন হওয়া উচিত যেখানে একটি শিশু শুধু বইয়ের জ্ঞান অর্জন করবে না; সে নিজের কথা প্রকাশ করতে পারবে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।
শিক্ষার মান নির্ধারণে নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর জোর
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নিয়মিত মনিটরিং ও মূল্যায়ন জোরদার করার কথাও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কতটা শিখছে এবং শেখা বিষয় বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে কি না—এসব বিষয়কে মূল্যায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের ভবন আছে কি না কিংবা অবকাঠামোর জন্য কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে—এসবের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কার্যকরভাবে শিখছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।
এ কারণে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের কার্যক্রমে আরও কার্যকর নজরদারি এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিশুকেন্দ্রিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য
সরকার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শিশুকেন্দ্রিক ও মানসম্মত করার পরিকল্পনা করছে। এর অংশ হিসেবে কারিকুলাম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নতুন শিক্ষক নীতিমালা, মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, নতুন কারিকুলামে ইংরেজি বিষয়ের লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি স্পিকিং টেস্ট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে একটি সমন্বিত আইটি ব্যবস্থাও গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার আওতায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক আইডি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শেখার পরিবেশ উন্নত করতে পুষ্টিকর মিড-ডে মিল, বিনামূল্যে পোশাক, জুতা ও স্কুলব্যাগ দেওয়ার উদ্যোগের কথাও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নিয়োগ বাস্তবায়ন হলে কী পরিবর্তন আসতে পারে
৩০ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকস্বল্পতায় থাকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ও বিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপ কমিয়ে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নিয়োগের পাশাপাশি নতুন শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ, সঠিক বিদ্যালয়ে পদায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ শিক্ষকসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; বরং প্রতিটি শিশুর কার্যকর শেখা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার জন্য একটি মানসম্মত ও শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।