ট্র্যাকোমা নির্মূলে WHO-এর স্বীকৃতি পেল তিমুর-লেস্তে
স্বাস্থ্য ডেস্ক ||
দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের সাফল্য; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ট্র্যাকোমা আর জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা
চোখের সংক্রামক রোগ ট্র্যাকোমাকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে তিমুর-লেস্তে। দেশটির এই অর্জন আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে WHO জানায়, তিমুর-লেস্তে এখন ট্র্যাকোমা নির্মূলকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে WHO-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ট্র্যাকোমা জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আর কোনো দেশেই অবশিষ্ট থাকল না। তিমুর-লেস্তে ছিল এ অঞ্চলের সর্বশেষ দেশ, যেখানে ট্র্যাকোমা স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে থাকার আশঙ্কা ছিল।
বহু বছরের নজরদারি ও গবেষণার পর স্বীকৃতি
WHO জানিয়েছে, তিমুর-লেস্তেকে এই স্বীকৃতি দেওয়ার আগে কয়েক বছর ধরে রোগটির উপস্থিতি এবং সংক্রমণের মাত্রা নিয়ে বিস্তৃত তদন্ত করা হয়েছে।
২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশটির আতাউরো দ্বীপে শিশুদের পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার চোখের চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা রোগীদের স্ক্রিনিং এবং নির্দিষ্ট এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। এসব পরীক্ষায় ট্র্যাকোমার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতেও দেশটিতে বিভিন্ন গবেষণা ও নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়। সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আসে ২০২৫ সালের একটি জরিপ থেকে। ওই জরিপে দেশটির ১৩টি পৌরসভা থেকে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ৪,৯৪৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় এমন কোনো সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যার মাত্রা ট্র্যাকোমা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হওয়ার পর্যায়ে ছিল।
কী এই ট্র্যাকোমা?
ট্র্যাকোমা হলো Chlamydia trachomatis নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া চোখের একটি সংক্রামক রোগ। WHO-এর মতে, এটি বিশ্বে সংক্রমণের কারণে অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ এবং বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ ট্র্যাকোমার কারণে অন্ধত্ব বা দৃষ্টিশক্তির প্রতিবন্ধকতার শিকার। ২০২৬ সালের মার্চের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন যেখানে ট্র্যাকোমাজনিত অন্ধত্বের ঝুঁকি রয়েছে।
রোগটি আক্রান্ত ব্যক্তির চোখ বা নাকের নিঃসরণের সংস্পর্শে হাত, কাপড়, বিছানাপত্র কিংবা বিভিন্ন পৃষ্ঠের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। মাছিও সংক্রমণ ছড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বারবার সংক্রমণ হলে চোখের পাতার ভেতরে ক্ষত তৈরি হতে পারে। একপর্যায়ে চোখের পাপড়ি ভেতরের দিকে ঘুরে গিয়ে কর্নিয়ায় ঘর্ষণ সৃষ্টি করে। চিকিৎসা না হলে এতে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হতে পারে।
তিমুর-লেস্তের অর্জনকে স্বাগত WHO-এর
WHO মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস তিমুর-লেস্তের এই অর্জনকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, মাঠপর্যায়ে সতর্ক তদন্ত এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে তিমুর-লেস্তে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্বের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য দেখিয়েছে। তাঁর মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল থেকে ট্র্যাকোমা নির্মূল হওয়া ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী রোগটি নির্মূলের লক্ষ্যের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
তিমুর-লেস্তের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও এই অর্জনকে জাতীয় গর্বের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. এলিয়া এ. দোস রেইস আমারাল বলেন, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন অংশীদারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সাফল্য এসেছে।
নির্মূল হলেও নজরদারি বন্ধ হচ্ছে না
WHO-এর স্বীকৃতি পাওয়ার অর্থ এই নয় যে তিমুর-লেস্তে চোখের রোগ সংক্রান্ত সব ধরনের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। দেশটিতে ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্ন ট্র্যাকোমা-সম্পর্কিত জটিলতা শনাক্ত ও চিকিৎসার সক্ষমতা বজায় রাখা হবে।
বিশেষ করে ট্র্যাকোমার জটিল পর্যায় ট্রাইকিয়াসিস আক্রান্ত রোগীদের শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। ডিলির Hospital Nacional Guido Valadares-এর National Eye Centre-এ ট্রাইকিয়াসিসের অস্ত্রোপচারসহ বিশেষায়িত সেবা দেওয়া হচ্ছে এবং পৌরসভাগুলোতেও এ ধরনের সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির সুযোগ বাড়ানোর জাতীয় কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। ট্র্যাকোমা পর্যবেক্ষণও বিদ্যমান জাতীয় রোগ ও অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের (NTD) নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন মাইলফলক
তিমুর-লেস্তে হলো WHO-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের চতুর্থ দেশ এবং বিশ্বব্যাপী ৩৩তম দেশ, যাকে ট্র্যাকোমা জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূল করার স্বীকৃতি দিয়েছে WHO।
WHO জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য সদস্যদেশগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে ট্র্যাকোমা কখনোই জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বা সন্দেহভাজন ছিল না। ফলে তিমুর-লেস্তের স্বীকৃতির মাধ্যমে এই অঞ্চলে রোগটির জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূলের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলো।
বিশ্বব্যাপী অবশ্য ট্র্যাকোমা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। WHO ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ট্র্যাকোমাকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ২০২৬ সালের WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকা এখনো রোগটির সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত অঞ্চল এবং বিশ্বের বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ট্র্যাকোমা বিদ্যমান।
তিমুর-লেস্তের সাফল্য তাই শুধু একটি দেশের রোগ নিয়ন্ত্রণের অর্জন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব মোকাবিলায় কীভাবে অগ্রগতি সম্ভব—তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।