অক্টোবরে দেশে সাশ্রয়ী স্মার্টফোনের স্থানীয় উৎপাদন শুরু
ঢাকা প্রতিনিধি ||
সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে স্মার্টফোন পৌঁছে দিতে দেশে সাশ্রয়ী স্মার্টফোনের স্থানীয় উৎপাদন আগামী অক্টোবর থেকে শুরু করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মাধ্যমে বর্তমানে স্মার্টফোন ব্যবহার না করা বিপুলসংখ্যক মানুষকে ধীরে ধীরে ডাটা সংযোগসহ স্মার্টফোন ব্যবহারের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (BSS) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কৃষিশ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালকসহ সাধারণ মানুষের জন্য স্মার্টফোনের কার্যকর মূল্য ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
উৎপাদন শুরু হতে পারে অক্টোবরের মাঝামাঝি
রেহান আসিফ আসাদ জানান, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রথম ফোন শিগগিরই বাজারে আসতে পারে। আর ডিলারদের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ স্থানীয় উৎপাদন অক্টোবরের মাঝামাঝি নাগাদ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, মোবাইল অপারেটর এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। উৎপাদনকারীদের পক্ষ থেকে কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা ও কর-সংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বাজেটে প্রয়োজনীয় খাত ও ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন উপদেষ্টা। উৎপাদনকারীরা উদ্যোগটির প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চীনেও কয়েক সপ্তাহ কাজ করেছেন।
ফোনের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৫৫ ডলার
প্রস্তাবিত ডিভাইসের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৫৫ ডলার হতে পারে বলে জানিয়েছেন রেহান আসিফ আসাদ। এর মধ্যে প্রায় ১৭ ডলার খরচ হবে LCD স্ক্রিনে। মাদারবোর্ড, প্রসেসর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশে প্রায় ২৩ ডলার এবং ব্যাটারি ও কেসিংয়ে আরও ১৫ থেকে ১৬ ডলার খরচ হতে পারে।
উৎপাদনকারীরা প্রতিটি ডিভাইসে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। এসব সুবিধা ও অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে ফোনের দাম সাধারণ মানুষের জন্য আরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিন মাসের ফ্রি ডাটা ও ভয়েস প্যাকেজের পরিকল্পনা
শুধু ফোনের দাম কমানো নয়, ডিভাইসের সঙ্গে মোবাইল অপারেটরদের ভয়েস ও ডাটা সেবা যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। রেহান আসিফ আসাদ জানান, তিনটি মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে তিন মাসের জন্য বিনামূল্যে ডাটা ও ভয়েস সেবা দেওয়ার মাধ্যমে স্মার্টফোন প্যাকেজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে একজন গ্রাহকের জন্য স্মার্টফোনের কার্যকর ব্যয় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।
লক্ষ্য প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ
সরকারের পরিকল্পনায় আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না—এমন প্রায় পাঁচ কোটি মানুষকে ডাটা সংযোগসহ স্মার্টফোন ব্যবহারের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
উপদেষ্টার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাত কোটি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না এবং প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এখনো ফিচার ফোন ব্যবহার করছেন। ফলে কম দামের স্মার্টফোনের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবার সুযোগ আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী আরও প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য সরকারের সার্ভিস অবলিগেশন ফান্ড (SOF) ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এ তহবিলে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা।
স্মার্টফোন কেনায় EMI সুবিধা
স্মার্টফোন কেনার সুযোগ আরও সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের EMI-সংক্রান্ত সুবিধার কথাও জানিয়েছেন রেহান আসিফ আসাদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মোবাইল ফোন কেনার ক্ষেত্রে EMI সুবিধা দেওয়ার ওপর আগের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের মোবাইল ফোন কেনার জন্য কিস্তি সুবিধা দিতে পারবে।
সরকারের পরিকল্পনায় ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও দামের স্মার্টফোন তৈরি করার কথাও রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অনেক মানুষ এখনো বাটন ফোন ব্যবহার করেন—তাই তাদের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে ডিভাইসের নকশা ও সুবিধা নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ
সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু কম দামে স্মার্টফোন বিক্রি নয়; বরং বিপুলসংখ্যক মানুষকে মোবাইল ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার আওতায় নিয়ে আসা। স্থানীয় উৎপাদন, উৎপাদনকারীদের ভর্তুকি, অপারেটরদের ডাটা-ভয়েস প্যাকেজ এবং কিস্তি সুবিধাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে স্মার্টফোনের কার্যকর ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে অক্টোবর থেকে স্থানীয় উৎপাদন শুরু করার বিষয়টি বর্তমানে সরকারের পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল। পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন ও বাজারে ডিভাইসের প্রাপ্যতা বাস্তবে কত দ্রুত নিশ্চিত হবে, তা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে।