তীব্র গরমে রান্নাঘরও হয়ে উঠছে স্বাস্থ্যঝুঁকির জায়গা
স্বাস্থ্য ডেস্ক ||
বাংলাদেশে তীব্র গরমের মধ্যে রান্নাঘরের অতিরিক্ত তাপ নারীদের জন্য নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে ছোট ও অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচলকারী রান্নাঘরে দীর্ঘসময় চুলার সামনে কাজ করলে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা ও রক্তচাপের ওঠানামার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা রান্নাঘরে কাজ করা নারীদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাইরে তীব্র গরমের সঙ্গে চুলার তাপ যোগ হয়ে রান্নাঘরের পরিবেশ আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে।
দিনে ১০ ঘণ্টা রান্নার কাজ, রাতে আবার নিজের ঘরে
ঢাকার পশ্চিম ধানমন্ডির রায়েরবাজার এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে সাত-আটটি পরিবার একটি রান্নাঘর ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে। সেখানে দিনভর পালাক্রমে রান্না চলে। একইভাবে কমলাপুরের সর্দার কলোনিতেও গৃহকর্মীরা বিভিন্ন বাসায় রান্নার কাজ করেন।
গৃহকর্মী শিলা জানান, তিনি দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা অন্যের বাসায় রান্নার কাজ করেন। কাজ শেষে নিজের বাসায় ফিরেও স্বামী-সন্তানদের জন্য রান্না করতে হয়। ছোট জানালার কারণে রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বাতাস ঢোকে না। ফলে গরমে দীর্ঘসময় চুলার সামনে থাকলে তার মাথা ঘোরে এবং শরীরে জ্বালাপোড়ার অনুভূতি হয়।
চুলার তাপের সঙ্গে যোগ হচ্ছে বাইরের গরম
বিশেষজ্ঞদের মতে, রান্নার সময় চুলা ও গরম ধাতব পৃষ্ঠ থেকে সরাসরি তাপ এবং রান্নার ফলে তৈরি গরম বাতাস শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। তাপপ্রবাহের সময় বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে এই অতিরিক্ত তাপ যুক্ত হওয়ায় রান্নাঘরে কাজ করা নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে যেখানে জানালা ছোট, বায়ু চলাচল সীমিত এবং একটানা রান্না চলে, সেখানে তাপ আটকে গিয়ে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ব্র্যাক জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক ফারজানা মিশা রান্নাঘরকে নারীদের জন্য ‘অদৃশ্য তাপ অঞ্চল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, চুলা জ্বালানোর পর রান্নাঘরের পরিবেশ দ্রুত বদলে যায় এবং নারীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই পরিবেশে কাজ করতে হয়।
কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে
সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. কামরুল হাসানের মতে, দীর্ঘসময় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকলে মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মাথাব্যথা ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ও চোখের সমস্যা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যজটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপ ও পানিশূন্যতা বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা একটি পরীক্ষামূলক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, রান্নার সময় চুলার আশপাশের তাপমাত্রা প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তাপপ্রবাহের সময় এই অতিরিক্ত তাপ শরীরের ওপর আরও বেশি চাপ তৈরি করতে পারে।
ছোট ও অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচলকারী রান্নাঘর বড় সমস্যা
শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই অনেক রান্নাঘর ছোট এবং পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনবিহীন। ঢাকার কিছু বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একাধিক পরিবারকে একই রান্নাঘর ব্যবহার করতে হয়। কোথাও কোথাও টিনের ছাউনি ও ছোট জানালার কারণে রান্নার তাপ দীর্ঘসময় আটকে থাকে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে রান্নাঘরের ন্যূনতম আয়তন ও উচ্চতার মান নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে অনেক ভবনে রান্নাঘরের জায়গা ও বায়ু চলাচলের সুযোগ সীমিত বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
স্থপতিদের মতে, বড় জানালা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, চিমনি বা এক্সহস্ট ফ্যান এবং তুলনামূলক কম তাপ উৎপন্নকারী রান্নার ব্যবস্থা রান্নাঘরের পরিবেশ উন্নত করতে পারে।
উন্নত চুলা ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ওপর জোর
বিশ্বব্যাংকের ‘Bangladesh: Healthier Homes through Improved Cookstoves’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উন্নত চুলা ব্যবহারে রান্নাঘরের ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণার দূষণ ২০ শতাংশের বেশি এবং কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা সর্বোচ্চ প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা রান্নাঘরের জানালা খোলা রাখা, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা বাড়ানো এবং সম্ভব হলে ফ্যান বা এক্সহস্ট ব্যবস্থা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। রান্নার সময় পর্যাপ্ত পানি পান এবং অতিরিক্ত গরমে শরীর ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন তারা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহের সঙ্গে রান্নাঘরের অতিরিক্ত তাপও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।