অনলাইন, ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিজ্ঞাপন 728 × 90
সর্বশেষ খবর
সূর্যের আলোতেই ছুটবে অ্যাম্বুলেন্স, থামলে বাড়বে চার্জ: ‘স্টেলা জুভা’র সফল কেনিয়া পরীক্ষা মেয়েদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এখন স্মৃতি মান্ধানার এআই-নির্ভর প্রযুক্তিতে শেয়ারবাজারে বড় উত্থান, বিনিয়োগকারীদের নজরে Nvidia প্রাথমিকের ৪র্থ-৫ম শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে খেলাধুলা, ২০২৭ সালে আসছে ক্রীড়া পাঠ্যবই ভোলায় ২৭ সিনেমা হলের মধ্যে চালু আছে মাত্র ২টি তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মামলায় নতুন মোড়, পিবিআই প্রতিবেদন নিয়ে শুনানি ২০ অক্টোবর ঘরোয়া ক্রিকেটারদের জন্য সুখবর, দ্বিগুণ হলো ম্যাচ ফি ব্রেন টিউমারের তিন অস্ত্রোপচার পেরিয়ে সুস্থতার পথে তানিয়া বৃষ্টি ট্র্যাকোমা নির্মূলে WHO-এর স্বীকৃতি পেল তিমুর-লেস্তে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে Hugging Face কিনছে Nvidia, AI দুনিয়ায় বড় কৌশলগত পদক্ষেপ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ ৩৫০ রানের ইতিহাস, তামিমের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় তাওহীদ হৃদয় ডেঙ্গুতে আরও ৪ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১,২৫২ তিন বছরে বন্ধ ৪০২ পোশাক কারখানা: বাণিজ্যমন্ত্রী জুলাই আন্দোলনের দুই হত্যা মামলায় রিয়াজের আগাম জামিন আবেদন খারিজ
হোম বিনোদন ভোলায় ২৭ সিনেমা হলের মধ্যে চালু আছে মাত্র ২টি

ভোলায় ২৭ সিনেমা হলের মধ্যে চালু আছে মাত্র ২টি

নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৯:২৯ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 6
ভোলায় ২৭ সিনেমা হলের মধ্যে চালু আছে মাত্র ২টি

এআর সোহেব চৌধুরী,

চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি॥


ভোলার একসময়ের জমজমাট সিনেমা হল ব্যবসায় নেমেছে বড় ধরনের ধস। ভালো গল্প, শক্তিশালী চিত্রনাট্য, মানসম্মত নির্মাণ ও দক্ষ অভিনয়শিল্পীর অভাবের পাশাপাশি ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, পাইরেসি ও ওটিটি নির্ভর বিনোদনের বিস্তারে জেলার অধিকাংশ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে।


একসময় ভোলার সাত উপজেলায় ছড়িয়ে ছিল ২৭টি সিনেমা হল। বর্তমানে ভোলা সদর ও চরফ্যাশনে মাত্র দুটি সিনেমা হল চালু রয়েছে। সেগুলোও নিয়মিত নয়; দর্শক সংকট ও লোকসানের কারণে যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।


সিনেমা হল মালিকদের লোকসান সামাল দিতে না পারায় বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক হলের জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে মার্কেট, বহুতল ভবন, দোকানপাট, বাসাবাড়ি, হোটেল, গ্যারেজ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।


জানা গেছে, চরফ্যাশন উপজেলায় একসময় সাগরি, ফ্যাশন, সাগর, সবুজ, দুলারি ও রঙ্গিলা সিনেমা হল ছিল। মনপুরায় ছিল সনি ও ঝলক। লালমোহনে লালমনি, বিনোদন, মেঘনা, মধুচ্ছন্দা ও সংগীতা। তজুমদ্দিনে স্বাধীন, শশী ও সখী। দৌলতখানে বিউটি, আনন্দ, ডায়মন্ড ও অন্তরা। বোরহানউদ্দিনে রাজমনি, চিত্রমনি ও রূপালি এবং ভোলা সদরে অবসর, রূপসি ও অনুপম সিনেমা হল চালু ছিল।


বর্তমানে চরফ্যাশনের সবুজ সিনেমা হল এবং ভোলা সদরের রূপসি সিনেমা হল সীমিতভাবে চালু রয়েছে। বিশেষ করে সবুজ সিনেমা হলে মূলত ঈদকেন্দ্রিক সময়ে সিনেমা প্রদর্শন করা হয়।


চরফ্যাশনের সবুজ সিনেমা হলের ব্যবস্থাপক পান্না মিয়া বলেন, ঈদ উপলক্ষে সিনেমা চালানো হয়। বছরে দুই ঈদে কিছু দর্শক আসে এবং কয়েক দিন হল চলে। এরপর সারা বছর বন্ধ থাকে। খরচ না ওঠা এবং দেশে ভালো মানের সিনেমা নির্মাণ না হওয়ায় দর্শক হলে আসেন না।


সিনেমাপ্রেমীদের কয়েকজন জানান, আশি ও নব্বইয়ের দশকের সিনেমার গল্প, গান, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, অভিনয় ও চিত্রায়ণে আলাদা আবেগ ছিল। দেশ ও গ্রামের বাস্তব চিত্র, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য অ্যাকশন এবং চরিত্রের সঙ্গে মানানসই অভিনয় দর্শকদের আকৃষ্ট করত।


তাদের অভিযোগ, বর্তমান সময়ে অনেক সিনেমায় অতিরিক্ত অ্যাকশন, দুর্বল সংলাপ, অন্য দেশের সিনেমার গল্প বা অভিনয় অনুসরণের প্রবণতা এবং মানহীন গান ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দেখা যায়। ফলে দর্শকদের একটি বড় অংশ সিনেমা হলের পরিবর্তে ইউটিউব, ফেসবুক ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিনোদনের সুযোগ বেছে নিচ্ছেন।


দর্শকদের ভাষ্য, এখন দেশি-বিদেশি সিনেমা ও বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কনটেন্ট ঘরে বসেই সহজে দেখা যায়। ফলে মানসম্মত সিনেমা ছাড়া টাকা ও সময় ব্যয় করে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না।


ভোলার রূপসি সিনেমা হলের ম্যানেজার ফিরোজ মিয়া বলেন, ছবি চালাতে গিয়ে যদি পুঁজি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কেউ সিনেমার ব্যবসা করবে না। একটি শোতে ১০ থেকে ২০ জন দর্শক এলেও প্রতিদিনের খরচ ওঠে না। এভাবে দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।


তিনি বলেন, পরিচালকরা ভালো সিনেমা দিতে পারলে এবং পাইরেসি ও কপিরাইট লঙ্ঘন বন্ধ করা গেলে দর্শক আবারও সিনেমা হলে ফিরতে পারেন। এতে হল মালিক ও কর্মচারীরাও লোকসান থেকে বাঁচার সুযোগ পাবেন।


চরফ্যাশন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির আহ্বায়ক সদস্য জসিমউদ্দীন টিপু বলেন, সিনেমার সেই জৌলুস ও জমজমাট ব্যবসা এখন আর নেই। শক্তিশালী স্ক্রিপ্টের অভাব, দক্ষ কলাকুশলীর সংকট, দুর্বল চিত্রনাট্য, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং সিনেমা নির্মাণে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন।


তার মতে, একটি সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ভালো গল্প ও শক্তিশালী চিত্রনাট্য। গল্প ভালো না হলে বড় বাজেট কিংবা জনপ্রিয় তারকা দিয়েও মানসম্মত সিনেমা তৈরি করা সম্ভব নয়।


তিনি আরও বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ক্যামেরা, আলোকসজ্জা, বাস্তবধর্মী চিত্রায়ণ, প্রাণবন্ত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন গান ও নাচের সমন্বয় প্রয়োজন। মানুষের জীবন ও বাস্তবতার গল্পকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে হবে।


ভোলার কৃতী সন্তান ও চলচ্চিত্র পরিচালক বেলাল সানি বলেন, একটি ভালো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সারা বিশ্বের কাছে একটি দেশকে উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু বর্তমানে কিছু ভুল মানুষের হাতে চলচ্চিত্র নির্মাণের দায়িত্ব চলে যাওয়ায় শিল্পটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


তার মতে, একটি ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ভালো গল্প, দক্ষ টিম, ভালো চিন্তার প্রযোজক এবং প্রয়োজনীয় বাজেট থাকা জরুরি।


তিনি বলেন, ঈদের কিছু চলচ্চিত্র ছাড়া সারা বছর যে ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে, তার একটি অংশ চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিছু চলচ্চিত্রের মান এমন পর্যায়ে নেমেছে, যেগুলোকে ভালো নাটকের সঙ্গেও তুলনা করা কঠিন।


বেলাল সানি আরও বলেন, চলচ্চিত্রের মান নিশ্চিত করতে সেন্সর বোর্ডের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। নিম্নমানের চলচ্চিত্র নিরুৎসাহিত করা গেলে নির্মাতারাও ভালো কাজের দিকে মনোযোগী হবেন।


তিনি জানান, কয়েক দশক আগে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে ৫০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজেট ব্যয় হতো। বর্তমানে কিছু চলচ্চিত্র মাত্র ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ অনেক নাটকের বাজেটও ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। এমন অবস্থায় দর্শক কেন হলে গিয়ে অর্থ ব্যয় করে নিম্নমানের সিনেমা দেখবেন—এ প্রশ্নও তিনি তোলেন।


তার মতে, পুরোনো অভিনয়শিল্পীদের নতুনভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি নতুন শিল্পীদেরও ভালো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুযোগ দিতে হবে। একজন দক্ষ পরিচালক একজন পুরোনো শিল্পীকেও নতুনভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পারেন।


বেলাল সানির বিশ্বাস, ভালো গল্প, ভালো নির্মাণ এবং সঠিক উপস্থাপনাই পারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আবারও ঘুরে দাঁড় করাতে।


এদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলোর জায়গায় ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ভোলার অবসর সিনেমা হলের জায়গায় নির্মিত হয়েছে ‘অবসর সেন্টার’ নামে মার্কেট। অনুপম সিনেমা হলের জায়গায় ভবন নির্মাণ হয়েছে। চিত্রমণির জায়গায় হয়েছে গোডাউন, শশীর জায়গায় মার্কেট এবং সাগরির জায়গায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার।


এ ছাড়া ফ্যাশন সিনেমা হলের জায়গা দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও সামনের অংশে ভাঙারি ও লোহালক্করের দোকান গড়ে উঠেছে। দুলারি সিনেমা হলের জায়গায় নির্মিত হয়েছে বাসাবাড়ি। রূপালি সিনেমা হলের জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।


একসময় যে সিনেমা হলগুলো ছিল ভোলার মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, সময়ের পরিবর্তনে সেসব জায়গার বড় অংশ এখন বাণিজ্যিক স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।


সংশ্লিষ্টদের মতে, দর্শকদের আবার সিনেমা হলে ফেরাতে হলে শুধু হল খুললেই হবে না; প্রয়োজন শক্তিশালী গল্প, মানসম্মত চিত্রনাট্য, দক্ষ নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, মৌলিক সংগীত এবং আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ। একই সঙ্গে পাইরেসি বন্ধ ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।