বিশ্বে চিকিৎসক সংকটের আশঙ্কা—অবসরের মুখে প্রতি চারজনের একজন চিকিৎসক, সতর্ক করল WHO
স্বাস্থ্য ডেস্ক ||
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং অসম বণ্টন নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। সংস্থাটির ২০২৬ সালের National Health Workforce Accounts: Health Workforce Levels and Trends প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের গড়ে প্রায় প্রতি চারজন চিকিৎসকের একজনের বয়স ৫৫ বছরের বেশি। সর্বশেষ তথ্য পাওয়া ১২২টি দেশের হিসাবে, আগামী এক দশকে এসব চিকিৎসকের অবসরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
WHO-এর ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগের। এসব দেশে গড়ে প্রায় প্রতি তিনজন চিকিৎসকের একজনের বয়স ৫৫ বছরের বেশি। ফলে একদিকে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অবসর, অন্যদিকে বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বৃদ্ধি—দুই ধরনের চাপই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে।
২০৩০ সালে ১ কোটি ১১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির আশঙ্কা
WHO-এর হিসাবে, বিশ্বে বর্তমানে স্বাস্থ্য ও সেবা খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৭ কোটিরও বেশি। গত দুই দশকে চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, দন্ত চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টসহ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্বও বেড়েছে।
তবে এই অগ্রগতি সব দেশ ও অঞ্চলে সমান নয়। WHO বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি প্রায় ১ কোটি ১১ লাখে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে ৬৭টি দেশে জনসংখ্যার স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী না থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বড় বৈষম্য
প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্বে দেশ ও অঞ্চলের বড় পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকা অঞ্চলের তুলনায় ইউরোপীয় অঞ্চলে চিকিৎসকের ঘনত্ব প্রায় ১৩ গুণ বেশি। নার্স ও মিডওয়াইফের ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় অঞ্চলের ঘনত্ব আফ্রিকা অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি।
অর্থাৎ, বিশ্বে মোট স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়লেও যেখানে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন বেশি, সেখানেই যে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে—এমনটি নয়। কর্মী সংকটের পাশাপাশি তাদের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বণ্টনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
বয়স বাড়ছে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও
WHO-এর নতুন প্রতিবেদনের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের বয়স বৃদ্ধির ওপর। সংস্থাটি বলছে, কর্মীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবসর নেওয়া চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জায়গায় নতুন কর্মী তৈরি ও নিয়োগের পরিকল্পনা না থাকলে বিদ্যমান ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
WHO-এর স্বাস্থ্যকর্মী নীতি ও তথ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ইউনিট প্রধান ড. খাসুম দিয়ালো বলেছেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের বয়স বাড়ার বিষয়টি ভবিষ্যতের জনবল সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যকর্মী পরিকল্পনা, শিক্ষা, নিয়োগ এবং কর্মীদের ধরে রাখার জন্য ভবিষ্যৎমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
শুধু নতুন চিকিৎসক তৈরি করলেই হবে না
WHO-এর প্রতিবেদনের মূল বার্তাগুলোর একটি হলো—চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সঠিক পরিকল্পনা ও বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি।
নতুন চিকিৎসক তৈরি করতে মেডিকেল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে অবসরের কারণে অভিজ্ঞ চিকিৎসক কমে গেলে নতুন কর্মীদের দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতেও সময় লাগতে পারে। তাই ভবিষ্যতে কোন দেশে কতজন চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন হবে, কোন খাতে কর্মীর ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং কোথায় তাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি—এসব বিষয় আগেভাগে বিবেচনায় নিয়ে জনবল পরিকল্পনা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে WHO।
স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও বাড়ছে
বিশ্বের অনেক দেশে জনসংখ্যার গড় বয়স বাড়ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও বাড়তে পারে। ফলে একই সময়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি অংশ অবসরের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বৃদ্ধি—দুই প্রবণতা ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
WHO জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সংস্থাটির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ৯০ শতাংশেরও বেশি সক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যকর্মী-সংক্রান্ত তথ্য দিয়েছে। ২০১৭ সালে জাতীয় স্বাস্থ্য জনবল হিসাব ব্যবস্থা (NHWA) চালুর পর থেকে স্বাস্থ্যকর্মী-সংক্রান্ত তথ্যের প্রাপ্যতা প্রায় ২০ গুণ বেড়েছে। সংস্থাটির মতে, উন্নত তথ্যভান্ডার ভবিষ্যৎ জনবল পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।