হরমুজ প্রণালিতে টোগো-নিবন্ধিত তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি ইরানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে টোগোর পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ‘Trend’ নামের জাহাজটি ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী অনুমোদিত পথের বাইরে দিয়ে ‘অবৈধভাবে’ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে সেটিতে আঘাত লাগে এবং পরে আগুন ধরে যায়। তবে হামলার ইরানি দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজটি একই কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
জাহাজে আগুন লাগার দাবি
ইরানের IRGC নৌবাহিনী জানিয়েছে, টোগো-নিবন্ধিত Trend জাহাজটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ইরানের দাবি, জাহাজটিতে আঘাতের পর আগুন ধরে যায় এবং সেটিকে থামানো হয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, জাহাজটির যাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্ররোচনা ও নির্দেশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। জাহাজটির কার্গো, ক্রু সদস্যদের অবস্থা বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিতও ইরান প্রকাশ করেনি।
একই সময়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সতর্কতা
ইরানের দাবির পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের UK Maritime Trade Operations (UKMTO) হরমুজ প্রণালির কাছে একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঘটনার কথা জানিয়েছে। সংস্থাটি ওমানের খাসাবের প্রায় ১৬ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে একটি জাহাজে অজ্ঞাত কোনো বস্তু আঘাত করার এবং আগুন লাগার খবর জানিয়েছে। তবে ওই ঘটনার জাহাজটি ইরানের উল্লেখ করা Trend কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
ফলে ইরানের হামলার দাবি এবং UKMTO-র নথিভুক্ত ঘটনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
হরমুজে কমেছে জাহাজ চলাচল
সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে Kpler-এর প্রাথমিক তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করে। এর আগের দিনের সংখ্যা ছিল ছয়টি, যেখানে ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১৬টি জাহাজ। একই সময়ে কয়েকটি LNG জাহাজ প্রণালির বাইরে পুনরায় চলাচল শুরু করেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। এর মাধ্যমে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, তেলজাত পণ্য ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ে চাপ তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে বাড়ছে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি ও আশপাশে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর ৮০টি হামলা তারা যাচাই করেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
IMO-এর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ ঘিরে চলমান পরিস্থিতিতে হাজার হাজার নাবিক ও বহু জাহাজ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, অঞ্চলটির অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
জ্বালানি বাজারে প্রভাব
হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে জাহাজে হামলার খবর আন্তর্জাতিক তেলবাজারে সরবরাহ ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রয়টার্সের ১৮ সেপ্টেম্বরের বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সৌদি আরবের তেল সরবরাহ-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০৪ ডলার ৪৯ সেন্ট এবং WTI প্রায় ১০২ ডলার ৭৯ সেন্ট পর্যায়ে ছিল।
তবে সর্বশেষ ঘটনাটির কারণে দীর্ঘমেয়াদে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কতটা ব্যাহত হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। জাহাজ চলাচল, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে।