জামায়াতের লংমার্চ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ, রাশেদ খানের মন্তব্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ঢাকা প্রতিনিধি ||
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের ঢাকা-রংপুর লংমার্চকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। শুক্রবার রংপুরে একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান এ কর্মসূচিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, লংমার্চের মাধ্যমে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক চাপ তৈরির পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে ফেরার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। তবে রাশেদ খানের বক্তব্যকে রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে; এর পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বলছে, ১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ তাদের ঘোষিত আট দফা দাবি আদায়ের একটি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি। জোটের নেতারা কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রংপুরে রাশেদ খানের বক্তব্য
শুক্রবার রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শন এবং অন্যান্য কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাশেদ খান। তিনি বলেন, লংমার্চ একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মসূচি এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে এমন কর্মসূচির যৌক্তিকতা তিনি দেখছেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কর্মসূচিটি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে পারে।
রাশেদ খান আরও অভিযোগ করেন, লংমার্চের কারণে জ্বালানি তেল ব্যয় হচ্ছে এবং চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে এ ধরনের গাড়িবহরভিত্তিক কর্মসূচি জনদুর্ভোগ বাড়াতে পারে। তিনি জামায়াতের পরিবর্তে সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জ্বালানি ও অন্যান্য জাতীয় সমস্যা সমাধানের পক্ষে মত দেন।
তাঁর বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জামায়াতের কর্মসূচি নিয়ে অভিযোগ। রাশেদ খানের দাবি, লংমার্চকে কেন্দ্র করে রাজপথে অস্থিরতা তৈরি হলে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে ফেরার সুযোগ পেতে পারে। তবে এটি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও আশঙ্কা; কোনো স্বাধীন সূত্রে এমন সম্ভাবনার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আট দফা দাবিতে লংমার্চ
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আগামী শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে এবং সকাল ৮টার দিকে গাড়িবহর রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা রয়েছে। পথে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধায় পথসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচির সমাপনী সমাবেশ রংপুর জিলা স্কুল মাঠে হওয়ার কথা।
আয়োজকদের ঘোষিত আট দফার মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর এটি ১১ দলীয় জোটের দ্বিতীয় বড় আঞ্চলিক লংমার্চ কর্মসূচি। আগের কর্মসূচিতে ছয় দফা দাবি থাকলেও রংপুরের কর্মসূচিতে প্রথমে সাত এবং পরে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দাবি যুক্ত হয়ে তা আট দফায় উন্নীত হয়েছে।
জামায়াতের পাল্টা বক্তব্য
লংমার্চ নিয়ে রাশেদ খানের সমালোচনার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন। শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, কোনো ধরনের উসকানিতে না গিয়ে নেতাকর্মীদের ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখতে হবে।
গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, কর্মসূচি সম্পর্কে প্রশাসন, পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের সাময়িক ভোগান্তি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
লংমার্চকে কেন্দ্র করে এখন মূলত দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। রাশেদ খান এটিকে বর্তমান সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন এবং এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, তারা বিদ্যুৎ, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন জনস্বার্থের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছেন।
এ অবস্থায় ১৯ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আয়োজকদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে সম্ভাব্য প্রভাব—দুই বিষয়ই সামনে এসেছে।