জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে চাপ বাড়ছে
ঢাকা প্রতিনিধি ||
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস—LNG—এর দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহের চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা ও তৈরি পোশাক খাতে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে LNG সরবরাহের একটি অংশ পুনরুদ্ধার হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতিও দেখা গেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ-ঝুঁকি, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত ও সরবরাহগত সীমাবদ্ধতার সমন্বিত চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ সংকটে LNG বাজারে অস্থিরতা
বাংলাদেশের LNG আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। হরমুজ প্রণালি দিয়ে LNG পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় এশিয়ার বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রয়টার্সের ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়ার স্পট LNG-এর দাম প্রায় ৩০ ডলার প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (MMBtu)-এর কাছাকাছি উঠেছে। শীত মৌসুমে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও কঠিন হলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা রয়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের আরেক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। তবে কয়েকটি LNG জাহাজের চলাচল আবার দেখা গেছে, যা সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কিছু সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্লুমবার্গের তথ্য উদ্ধৃত করে গ্যাসক্যাপটেন জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে অন্তত দুটি LNG চালান হরমুজ প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না থাকলেও স্বাভাবিক প্রবাহ এখনো ফিরেনি।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের গুরুত্ব
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট স্থাপিত ক্ষমতা ছিল ৩২,৬৮৮ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎও অন্তর্ভুক্ত।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০–৬৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আসে এবং দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিকৃত LNG দিয়ে এই চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা হয়। বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত LNG আমদানি করছে।
ফলে আন্তর্জাতিক LNG বাজারে দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকট ও উচ্চমূল্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশ তার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে আমদানিকৃত LNG-এর ওপর নির্ভরশীল।
শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকটের প্রভাব
বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি গ্যাসের চাপ সরাসরি শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, সিরামিক ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পে কম গ্যাসের চাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সাম্প্রতিক মূল্যায়নের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৪০০টির বেশি কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মুখে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২টি কারখানা সংকট অব্যাহত থাকলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন—BGMEA-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, গ্যাস সংকটের কারণে কিছু কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
তবে এসব প্রভাবের সবটাই সরাসরি হরমুজ সংকটের কারণে হয়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। দেশের একটি LNG টার্মিনালে জুলাই মাসে অগ্নিকাণ্ডের পর সরবরাহ কমে যাওয়াও সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটকে তীব্র করেছিল।
LNG সরবরাহে কিছুটা উন্নতি
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন দুপুরে দেশের গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন (MMCFD)-এ পৌঁছেছিল, যা জুলাইয়ের শেষ দিকের LNG টার্মিনাল সংকটের পর সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।
অর্থাৎ, দেশে গ্যাস সরবরাহের তাৎক্ষণিক পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি এলেও আন্তর্জাতিক LNG বাজারের মূল্য ও সরবরাহ-ঝুঁকি এখনো বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ
LNG বাজারের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টাও করছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কোম্পানি Gunvor-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি LNG সরবরাহ চুক্তির একটি প্রস্তাব উচ্চমূল্যের কারণে আটকে রয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে ২০২৬–২০২৮ সালের LNG-এর দাম এশিয়ার JKM স্পট বেঞ্চমার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা ছিল।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মোট ১১৫টি LNG কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে QatarEnergy-এর ৪০টি এবং ওমানের OQ Trading-এর ১৬টি কার্গোসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এসব সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
হরমুজ প্রণালিতে LNG পরিবহন কিছুটা পুনরায় শুরু হলেও আন্তর্জাতিক বাজার এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের মধ্যে সীমিত LNG সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে। একই সময়ে ইউরোপের গ্যাস মজুতও মৌসুমের তুলনায় নিচে রয়েছে, যা বৈশ্বিক LNG বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো—স্বল্পমেয়াদে LNG আমদানির ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এবং শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।