কুমিল্লা বোর্ডে এইচএসসি ফলে তলানিতে নোয়াখালী, পাসের হার মাত্র ৩৮.৯০ শতাংশ
“শিক্ষার মান ও পাঠদান নিয়ে প্রশ্ন, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সংশ্লিষ্টদের”
চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছয় জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে নোয়াখালী। জেলাটিতে পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। বিপরীতে ৫৩ দশমিক ৫২ শতাংশ পাসের হার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে কুমিল্লা। ফলাফলের এই চিত্র নোয়াখালীর শিক্ষার মান, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বোর্ডের প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এবার কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৯২ হাজার ১৬২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ৪৪ হাজার ২৭২ জন। বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। জেলাভিত্তিক ফলাফলে কুমিল্লায় পাসের হার ৫৩ দশমিক ৫২, ফেনীতে ৫২ দশমিক ১৬, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫০ দশমিক ১৫, চাঁদপুরে ৪৫ দশমিক ৩৫, লক্ষ্মীপুরে ৪১ দশমিক ২৯ এবং নোয়াখালীতে ৩৮ দশমিক ৯০ শতাংশ।
পরিসংখ্যান বলছে, বোর্ডের গড় পাসের হারের চেয়ে নোয়াখালী ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ পিছিয়ে। এমনকি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা লক্ষ্মীপুরের তুলনায়ও নোয়াখালীর পাসের হার ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ কম। আর সর্বোচ্চ পাসের হার অর্জনকারী কুমিল্লার সঙ্গে ব্যবধান ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এই ব্যবধানকে নিছক পরীক্ষার ফলাফলের পার্থক্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং জেলার শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতা অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তাই সামনে এনেছে।
এবারের ফলাফলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো করেছে। বোর্ডে ছেলেদের পাসের হার ৪৩ দশমিক ১৭ শতাংশ, বিপরীতে মেয়েদের পাসের হার ৫১ দশমিক ২৬ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৬ হাজার ৭২৮ জন ছেলের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৫ হাজার ৮৫৭ জন। অন্যদিকে ৫৫ হাজার ৪৩৪ জন মেয়ের মধ্যে পাস করেছে ২৮ হাজার ৪১৫ জন।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো করেছে। এ বিভাগে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৪০ দশমিক ৭৩ এবং মানবিক বিভাগে ৪১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। বোর্ডের অধীনে ৪৫৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ১৯৩টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। শতভাগ পাস করেছে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান।
ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর ইংরেজি ও উচ্চতর গণিতে শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ হয়েছে। নিম্ন শ্রেণি থেকেই এসব বিষয়ে মৌলিক ধারণা ও ভিত্তি পরিষ্কার না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। এ বিষয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আরও সচেতন হতে হবে।
তবে নোয়াখালীর ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে শুধু ইংরেজি ও উচ্চতর গণিতে দুর্বলতাকে দায়ী করলেই চলবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল, শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ, নিয়মিত উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মাধ্যমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের ভিত্তি কতটা মজবুত হচ্ছে, কলেজগুলোতে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত হচ্ছে কি না এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষার ফলাফল খারাপ হলে শুধু শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকদের দায়ী করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি সব দায় শিক্ষকদের ওপর চাপিয়েও সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষা প্রশাসনের সম্মিলিত দায়িত্ব। ফলে নোয়াখালীর এই ফলাফলকে সাময়িক ব্যর্থতা হিসেবে উপেক্ষা না করে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত উপজেলা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে পিছিয়ে পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করা। ইংরেজি ও গণিতে বিশেষ পাঠদান, নিয়মিত পরীক্ষা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অধ্যয়ন, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।
এদিকে, সারা দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ।
নোয়াখালীর শিক্ষার্থীদের মেধা ও সম্ভাবনার ঘাটতি নয়, বরং শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদানের মান ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, একটি জেলার শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা কেবল পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নে।
তাই প্রশ্ন উঠেছে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ছয় জেলার মধ্যে নোয়াখালী কেন সবার পেছনে? এই ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি কার্যকর পদক্ষেপ নেবে? নাকি প্রতিবছর ফলাফল প্রকাশের পর হতাশা ও আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে শিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্যোগ? নোয়াখালীর শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘুরে দাঁড় করাতে এখন প্রয়োজন দায়বদ্ধতা, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ।