মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা, ৫২৯ কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় কারখানার উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, আন্দোলনের কারণে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৫২৯টি কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক এর প্রভাবে পড়েছেন।
শ্রমিকদের প্রধান দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, নতুন করে মজুরি নির্ধারণ না হলে তাঁদের জীবনযাত্রার সংকট আরও বাড়বে।
গত ১ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১৪ এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। একপর্যায়ে মিরপুর-১১ এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। একই সময়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী ও চন্দ্রা এলাকায় সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে মোট ৫২৯টি কারখানার কার্যক্রম আন্দোলনের কারণে ব্যাহত হয়। সংগঠনটির হিসাবে, প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক এ পরিস্থিতির প্রভাবে পড়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ২ নভেম্বর অনেক কারখানা পুনরায় খুলেছে। তবে নতুন করে বিক্ষোভ বা সড়ক অবরোধ শুরু হলে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আবারও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
শ্রমিকদের দাবির প্রেক্ষাপটে সরকার ছয় সদস্যের একটি ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডের কাজ হবে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করে সুপারিশ তৈরি করা। শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে থাকা শ্রমিকনেতারা বর্তমান মজুরি পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, মালিকপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও জ্বালানি-নির্ভর ব্যয়ের অনিশ্চয়তা এবং রপ্তানি আদেশের চাপের কারণে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান রয়টার্সকে বলেছেন, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং শ্রমিকদের পর্যালোচনা প্রক্রিয়াকে এগিয়ে যেতে সুযোগ দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হলে ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতি প্রয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মজুরি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে এ খাতের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা, রপ্তানি চালান এবং দেশের বৈদেশিক আয়েও প্রভাব পড়তে পারে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এখন সরকারের পাশাপাশি মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের জন্যও বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।