মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গেলেন নারী
তিমির বনিক,
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৭(১) ধারায় নাবালক শিশুর পক্ষে তার মা সুমেনা বেগম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) মৌলভীবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা অভিযোগের পর বাদির জবানবন্দি গ্রহণ করে বিজ্ঞ আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কুলাউড়া থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক আদালতে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এর আগে আসামি ইমা আক্তার বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় নাবালক শিশু সায়েম মিয়াকে আসামি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে কুলাউড়া থানাধীন কর্মধা ইউনিয়নের দোয়ালগ্রাম এলাকায় ইমা আক্তারের শিশু কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগ এনে নাবালক সায়েম মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে কুলাউড়া থানায় মামলাটি রুজু হয় এবং জি.আর. মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। মামলায় নাবালক সায়েম মিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিজ্ঞ আদালত তাকে সেইফ কাস্টডিতে গাজীপুরে প্রেরণ করেন।
পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন, স্থানীয় ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ, ঘটনাস্থলের খসড়া মানচিত্র ও সূচিপত্র প্রস্তুতসহ প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তদন্তের পর নাবালক সায়েম মিয়া জামিনে মুক্তি পান।
বাদীপক্ষের দাবি, তদন্তে কথিত ঘটনার পক্ষে প্রয়োজনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষে অভিযোগটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মর্মে মতামত দিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোস্তাফিজুর রহমান চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৭ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও মতামত প্রদান করা হয়।
পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন এবং নাবালক সায়েম মিয়াকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে মূল মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।
এরপর নাবালক শিশুর পক্ষে তার মা সুমেনা বেগম অভিযোগ করেন, পূর্বের মামলাটি জেনেশুনে মিথ্যা ও ভিত্তিহীনভাবে দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলার কারণে তার নাবালক সন্তান ও পরিবার সামাজিক ও মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে। এ অভিযোগে তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৭(১) ধারায় ইমা আক্তারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বর্তমান মামলাটি দায়ের করেন।
বাদিনীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগটি কুলাউড়া থানাকে এজাহার হিসেবে গণ্য করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৭ ধারায় জেনেশুনে আইনানুগ কারণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে।
মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এম. সাইফুর রহমান, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
বাদীপক্ষের আইনজীবী এম. সাইফুর রহমান বলেন,“একজন নাবালক শিশুকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হলে তার প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। মিথ্যা ও হয়রানি মূলক মামলা দায়েরের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে—আজকের মামলাটি তারই একটি দৃষ্টান্ত। প্রতিপক্ষকে হয়রানি বা ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলার প্রবণতা কমাতে এ ধরনের আইনগত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা প্রত্যাশা করি, আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে মিথ্যা মামলা ও হয়রানি কমবে এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।”
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী আসলাম বলেন,“আজ সুমেনা বেগম বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ১৭ ধারায় ইমা আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। আমার চাকরি জীবনের ২২ বছরের ইতিহাসে মৌলভীবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১৭ ধারায় এ ধরনের মামলা এই প্রথম হয়েছে।