মুছাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণ: প্রতিশ্রুতির পরও অপেক্ষায় উপকূলবাসী
মোহাম্মদ উল্যা
নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি॥
ছোটবেলায় এক দাদির মুখে শোনা একটি গল্প আজও মনে পড়ে। মোবাইল ফোনের যুগ আসার আগে চিঠিই ছিল দূরের মানুষের খবর পাওয়ার প্রধান মাধ্যম। একদিন গ্রামের এক ব্যক্তি ডাকপিয়নকে দেখে জানতে চাইলেন, তাদের বাড়িতে কেন কোনো চিঠি আসে না। ডাকপিয়ন প্রশ্ন করলেন, পরিবারের কেউ কি বিদেশে বা শহরে থাকেন? লোকটি বললেন, না, তবে তাঁর এক ভাই নাকি বিদেশ যাবে যাবে করছেন।
গল্পটির হাস্যরসের আড়ালে যে অপেক্ষার কথা আছে, মুছাপুর ক্লোজারকে ঘিরে উপকূলবাসীর বর্তমান অপেক্ষার সঙ্গে তার যেন অদ্ভুত মিল রয়েছে। এখানে অপেক্ষা কোনো চিঠির নয়—অপেক্ষা একটি দৃশ্যমান সিদ্ধান্তের, কার্যকর উদ্যোগের এবং পুনর্নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর।
২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট প্রবল বন্যার পানির চাপে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুরের ২৩ ভেন্ট রেগুলেটর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে রেগুলেটরের বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এর ফলে কোম্পানীগঞ্জসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার পানি নিষ্কাশন, নদীভাঙন, জোয়ারের পানি এবং কৃষি ও জনজীবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের দাবিতে স্থানীয় জনগণ মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের নজরেও আসে। ২০২৫ সালের মে মাসে তৎকালীন পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মুছাপুর রেগুলেটরের পুনর্নির্মাণের চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান এবং ওই বছরেই নির্মাণকাজ শুরুর প্রত্যাশার কথা প্রকাশ করেন।
এরপর ২০২৬ সালের ১০ মার্চ নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের উদ্যোগে পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু মুছাপুর রেগুলেটর এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে প্রস্তাবিত রেগুলেটর নির্মাণসহ ছোট ফেনী ও বামনী নদী অববাহিকায় বন্যা ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়।
পরিদর্শনকালে পানি সম্পদমন্ত্রী মুছাপুর রেগুলেটরের পুনর্নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু হবে এবং অচিরেই তা দৃশ্যমান হবে বলে জানান।
কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব কাজের মধ্যে সময়ের ব্যবধানই এখন উপকূলবাসীর প্রধান উদ্বেগ। ২০২৪ সালের দুর্যোগের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মুছাপুর রেগুলেটরের স্থায়ী পুনর্নির্মাণের দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। বরং ২০২৬ সালের জুলাইতেও মুছাপুর ক্লোজারসংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙন রোধে জিওব্যাগ ফেলা, স্লুইসগেট পুনর্নির্মাণ এবং স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে মানববন্ধনের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এটি শুধু একটি রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের বিষয় নয়। মুছাপুর ক্লোজার ও রেগুলেটর উপকূলীয় জনপদের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ এবং মানুষের বসতভিটা রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই প্রকল্পের নকশা, অর্থায়ন, বাস্তবায়নকাল এবং কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে স্থানীয় জনগণের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
এক্ষেত্রে সরকারের কাছে উপকূলবাসীর প্রত্যাশা শুধু নতুন করে আশ্বাস নয়; তারা চায় সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা। প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ, টেন্ডার, নির্মাণকাজ শুরু এবং বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সীমা—প্রতিটি ধাপ জনসম্মুখে স্পষ্ট করা হলে মানুষের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে।
সরকারি নথিতেও মুছাপুর ক্লোজার, রেগুলেটর ও সংলগ্ন এলাকা রক্ষায় সন্দ্বীপ চ্যানেলের ভাঙন মোকাবিলায় প্রতিরক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণের তথ্য রয়েছে।
এখন প্রয়োজন কথার পুনরাবৃত্তি নয়, বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি। কারণ নদীর পানি অপেক্ষা করে না, ভাঙনও সময় দেখে আসে না। একটি বাঁধ, একটি রেগুলেটর কিংবা একটি ক্লোজারের ব্যর্থতার প্রভাব শুধু প্রকল্পের কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না—তার অভিঘাত পড়ে মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, জীবিকা ও নিরাপত্তার ওপর।
তাই উপকূলবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের কাছে মুছাপুর ক্লোজার ও রেগুলেটর পুনর্নির্মাণে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং দৃশ্যমান কাজ শুরুর দাবি জানানো হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মুছাপুরের মানুষের অপেক্ষা যেন আর সেই ‘ভাই বিদেশ যাবে যাবে’ গল্পের মতো দীর্ঘ না হয়—প্রতিশ্রুতির পর এবার তারা দেখতে চান বাস্তব কাজের শুরু।