NASA-র Roman Space Telescope উৎক্ষেপণ, ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটারের রহস্য উন্মোচনে নতুন অধ্যায়
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ||
মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে নতুন এক বৈজ্ঞানিক অভিযানে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA। রোববার (৩০ আগস্ট) সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে Nancy Grace Roman Space Telescope—যা ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার, বহির্গ্রহ এবং মহাবিশ্বের কাঠামো ও বিবর্তন নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফ্লোরিডার Kennedy Space Center-এর Launch Complex 39A থেকে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২৬ মিনিটে SpaceX-এর Falcon Heavy রকেটে করে উৎক্ষেপণ করা হয় টেলিস্কোপটি। উৎক্ষেপণের পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মহাকাশযানটি রকেটের দ্বিতীয় ধাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব যাত্রা শুরু করেছে। NASA জানিয়েছে, Roman এখন পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ লাখ মাইল (প্রায় ১৬ লাখ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত Sun-Earth Lagrange Point 2 বা L2-এর দিকে এগোচ্ছে।
ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটারের রহস্য
মহাবিশ্বের অধিকাংশ অংশ কী দিয়ে গঠিত, তার বড় একটি অংশ এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্য। দৃশ্যমান নক্ষত্র, গ্রহ ও গ্যালাক্সি মহাবিশ্বের মোট উপাদানের তুলনামূলকভাবে খুব ছোট অংশ। ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা যায় না, তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা যায়। অন্যদিকে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ক্রমেই দ্রুততর হওয়ার পেছনে যে অজানা শক্তিকে দায়ী করা হয়, সেটিই ডার্ক এনার্জি।
Roman-এর বিশাল আকাশ-দর্শন ক্ষমতা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা বিপুল সংখ্যক গ্যালাক্সির অবস্থান, গঠন ও পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করবেন। এর মাধ্যমে মহাবিশ্ব কীভাবে সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়েছে এবং এর সম্প্রসারণের গতি কেন পরিবর্তিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।
Hubble-এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত দৃষ্টিক্ষেত্র
Roman-এর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর wide-field পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। NASA বলছে, টেলিস্কোপটি Hubble-এর তুলনায় প্রায় ১,০০০ গুণ দ্রুত মহাবিশ্বের বিস্তৃত অঞ্চল জরিপ করতে পারবে। এর দৃষ্টিক্ষেত্র Hubble-এর চেয়ে ১০০ গুণেরও বেশি প্রশস্ত হওয়ায় একই সময়ে অনেক বড় এলাকার ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে
এর ফলে Roman বিপুল সংখ্যক গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করে মহাবিশ্বের একটি বৃহৎ ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরিতে সহায়তা করবে। NASA জানিয়েছে, পাঁচ বছরের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক মিশনে টেলিস্কোপটি বিলিয়নসংখ্যক গ্যালাক্সি নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে।
বহির্গ্রহ খোঁজেও বড় ভূমিকা
শুধু মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামো নয়, আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহ—অর্থাৎ exoplanet—নিয়ে গবেষণাও Roman-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
NASA-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, Roman বিপুল সংখ্যক নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করে নতুন বহির্গ্রহ শনাক্ত করতে সাহায্য করবে। এসব তথ্য ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীদের গ্রহব্যবস্থার গঠন, বিকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের গ্রহ কীভাবে সৃষ্টি হয়—তা আরও ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করবে।
টেলিস্কোপটিতে একটি coronagraph প্রযুক্তিও রয়েছে, যা উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো আংশিকভাবে আড়াল করে তার চারপাশে থাকা তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ বস্তুর পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবে। ফলে ভবিষ্যতের বহির্গ্রহ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তিন মাসের যাত্রা, এরপর শুরু হবে বৈজ্ঞানিক কাজ
উৎক্ষেপণের পর Roman-এর সামনে রয়েছে প্রায় তিন মাসের commissioning period। এ সময়ে টেলিস্কোপটি L2-এর দিকে যাত্রা করবে এবং এর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সিস্টেম ধাপে ধাপে চালু, পরীক্ষা ও ক্যালিব্রেট করা হবে।
NASA জানিয়েছে, Roman-এর প্রথম বৈজ্ঞানিক ছবি ২০২৭ সালের শুরুর দিকে প্রকাশের প্রত্যাশা রয়েছে। টেলিস্কোপটি প্রতিদিন প্রায় ১.৪ টেরাবাইট তথ্য পৃথিবীতে পাঠাতে সক্ষম হবে—যা NASA-এর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স মিশনগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ডেটা হারের একটি।
Hubble ও Webb-এর সঙ্গে নতুন সংযোজন
Roman, Hubble বা James Webb Space Telescope-এর বিকল্প হিসেবে নয়; বরং তাদের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। Hubble ও Webb যেখানে তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট মহাজাগতিক বস্তু বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণে সক্ষম, Roman সেখানে দ্রুত ও বিস্তৃত এলাকায় জরিপ চালিয়ে বিপুল সংখ্যক মহাজাগতিক বস্তুর তথ্য সংগ্রহ করবে।
এর ফলে Roman-এর জরিপ থেকে পাওয়া আকর্ষণীয় লক্ষ্যবস্তু পরবর্তী সময়ে Hubble বা Webb-এর মতো টেলিস্কোপ দিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
NASA বলছে, Roman-এর তথ্য শুধু ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি নয়—গ্যালাক্সি, কৃষ্ণগহ্বর, নক্ষত্র, গ্রহব্যবস্থা এবং মহাবিশ্বের বিবর্তনসহ জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিস্তৃত ক্ষেত্রের গবেষণায় ব্যবহার করা যাবে।
সফল উৎক্ষেপণের পর নতুন মহাকাশযাত্রা
NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, Roman সফলভাবে Falcon Heavy-এর দ্বিতীয় ধাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং যোগাযোগও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের দল মহাকাশযানটির বিভিন্ন সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করবে এবং পরবর্তী ধাপের মোতায়েন ও পরীক্ষা পরিচালনা করবে।
প্রায় ৪.৩ বিলিয়ন ডলারের এই মহাকাশ পর্যবেক্ষণাগার আগামী বছরগুলোতে মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি থেকে শুরু করে অগণিত নতুন গ্রহের সন্ধান—Roman-এর সংগৃহীত বিপুল তথ্য মহাকাশবিজ্ঞানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।