শিশুর হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার আগে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ
ঢাকা প্রতিনিধি ||
শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে শুধু ডিভাইসটি প্রয়োজন কি না, তা নয়—শিশুর বয়স, পরিপক্বতা, ফোন ব্যবহারের উদ্দেশ্য, কতক্ষণ ব্যবহার করবে এবং অনলাইনে কী দেখবে—এসব বিষয়ও বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন শিশুস্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর নিজের ডিভাইস ব্যবহারের পাশাপাশি অভিভাবকের স্মার্টফোন ব্যবহারের ধরনও শিশুর ভাষা বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ৭৪৭টি নরওয়েজীয় পরিবারের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, শিশুর প্রাথমিক অভিভাবকের বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের receptive vocabulary বা শোনা ও বোঝার শব্দভান্ডারের তুলনামূলক ধীর বিকাশের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণাটি JAMA Pediatrics-এ প্রকাশিত হয়েছে। তবে গবেষণাটি একটি সম্পর্ক দেখিয়েছে; এটি সরাসরি কারণ-ফলাফল প্রমাণ করে না।
শুধু শিশুর ফোন নয়, নজরে অভিভাবকের ফোনও
শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনায় সাধারণত শিশুর হাতে থাকা ফোন বা ট্যাবলেটের সময়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (AAP) বলছে, পরিবারে ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।
AAP-এর মতে, বাবা-মা বা অভিভাবক ফোনে অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকলে শিশুর সঙ্গে কথা বলা, চোখে চোখ রাখা এবং আবেগগত যোগাযোগের সময় কমে যেতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিকে গবেষণায় ‘technoference’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তাই শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস তৈরিতে অভিভাবকদের নিজেদের ফোন ব্যবহারের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
স্মার্টফোন মানেই ক্ষতিকর—এমন নয়
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের অর্থ এই নয় যে শিশুদের প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে হবে। ডিজিটাল মিডিয়া শিক্ষা, সৃজনশীলতা, তথ্য পাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
AAP-এর বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি হলো, সব শিশুর জন্য একই নির্দিষ্ট স্ক্রিন-টাইম সীমা আরোপের বদলে শিশুর বয়স, বিকাশ, কনটেন্ট এবং পরিবারের পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি পারিবারিক মিডিয়া পরিকল্পনা তৈরি করা। এতে ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, পারিবারিক সময় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন কাজ যেন স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে বাদ না পড়ে, সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বসে স্ক্রিন দেখার পরিবর্তে শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম এবং পরিবারের সঙ্গে বই পড়া বা গল্প করার মতো কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়েছে।
WHO-এর নির্দেশনায় ৩ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে sedentary screen time দিনে এক ঘণ্টার বেশি না রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—এবং কম হলে আরও ভালো। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রম ও ঘুম নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফোন দেওয়ার আগে কী ভাববেন অভিভাবকরা?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুকে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে—
* ফোনটি শিশুর প্রয়োজন, নাকি শুধু বন্ধুদের মতো হওয়ার ইচ্ছা—তা বোঝা;
* শিশুটি নিয়ম মেনে ডিভাইস ব্যবহার করতে কতটা সক্ষম, তা বিবেচনা করা;
* কোন অ্যাপ ব্যবহার করতে পারবে এবং কোন কনটেন্ট এড়িয়ে চলবে—আগেই নির্ধারণ করা;
* ঘুমের সময় ও শোবার ঘরকে ফোনমুক্ত রাখার নিয়ম করা;
* খাবারের সময় ও পারিবারিক কথোপকথনের সময় স্ক্রিন এড়িয়ে চলা;
* প্রয়োজন অনুযায়ী parental controls ব্যবহার করা;
* অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তি, ব্যক্তিগত তথ্য, সাইবারবুলিং ও অনুপযুক্ত কনটেন্ট সম্পর্কে শিশুকে বয়স উপযোগীভাবে বোঝানো;
* সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, অভিভাবকদের নিজেদের ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভালো উদাহরণ তৈরি করা।
AAP-এর Family Media Plan-এ সময়ের পাশাপাশি কনটেন্ট, screen-free zones, পারিবারিক যোগাযোগ, অনলাইন নিরাপত্তা এবং বাবা-মায়ের নিজস্ব মিডিয়া ব্যবহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারসাম্য
বিশেষজ্ঞদের বর্তমান অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা নয়—বরং তা যেন ঘুম, খেলাধুলা, পড়াশোনা, পারিবারিক যোগাযোগ ও বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্ককে সরিয়ে না দেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ছোট বয়সে শিশুর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, খেলাধুলা করা, বই পড়া এবং পারিবারিক সময় কাটানোর সুযোগ কমে গেলে তার বিকাশে কী প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে গবেষণা ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আগ্রহ বাড়ছে।
তাই শিশুর হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—“কত ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করবে?”-এর পাশাপাশি “ফোনটি তার জীবনের কোন জায়গা দখল করবে?”