সিএনএনের বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের ভুল হিসাবে নজিরবিহীন পরাজয়, সামনে আরও বড় বিপদ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বিশাল ভুল হিসাব’কেই দায়ী করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক স্টিফেন কলিনসনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই নজিরবিহীন পরাজয়ের পর ট্রাম্পের সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় রাজনৈতিক বিপদ।
কোথায় ভুল করলেন ট্রাম্প
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জনপ্রিয়তা তলানিতে থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এই নির্বাচনকে নিজেকে ঘিরেই সাজিয়েছিলেন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়ে যায়, যার চাপ পড়ে লাখো মার্কিন পরিবারের ওপর। এর মধ্যেও দেশে ‘স্বর্ণযুগ’ চলছে বলে ট্রাম্পের দাবি সাধারণ ভোটারদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলেনি। ডেমোক্র্যাটদের আসন কমাতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে আঁকার (জেরিম্যান্ডারিং) চেষ্টাও উল্টো ফল দিয়েছে বলে মনে করেন কলিনসন।
কেন নজিরবিহীন
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষই হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। সিএনএনের ভাষায়, এটি এমন এক ‘নীল ঢেউ’, যা রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও আঘাত হেনেছে। সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসের মতো রাজ্যেও সিনেট আসন জিতেছে ডেমোক্র্যাটরা। টেক্সাসে জেমস টালারিকোর জয়ে প্রায় চার দশক পর রাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট আসন পেল। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট চতুর্থ মেয়াদের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোহোসার কাছে হেরেছেন। ট্রাম্প-সমর্থিত টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও পরাজিত হয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ‘প্রথম’ও এসেছে। জিনা হিনোহোসা টেক্সাসের প্রথম লাতিনো নারী গভর্নর, কেইশা ল্যান্স বটমস জর্জিয়ার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর এবং আবদুল এল-সাইয়েদ মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম। হাকিম জেফ্রিস সম্ভবত হতে যাচ্ছেন প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার।
সিএনএনের বিশ্লেষণে এই পরাজয়কে ২০১০ সালে বারাক ওবামার, ২০০৬ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের এবং ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের মধ্যবর্তী নির্বাচনী বিপর্যয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তবে কলিনসনের মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচয়ই যেহেতু ‘বিজয়ী’ ভাবমূর্তির ওপর দাঁড়িয়ে, তাই এই হার তাঁর জন্য অনেক বেশি ব্যক্তিগত।
সামনে যেসব বিপদ
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস প্রশাসন, ইরান যুদ্ধ, হোয়াইট হাউসের কথিত দুর্নীতি এবং ট্রাম্পের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে একের পর এক তদন্ত শুরু করতে পারে। ট্রাম্পের সহযোগীদের সাক্ষ্য দিতে সমন জারি হতে পারে, যা নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘ সাংবিধানিক লড়াইয়ের দিকে গড়াতে পারে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের শেষ দুই বছরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও মন্ত্রিসভার মনোনয়ন আটকে দিতে পারবে। জানুয়ারির আগে ইরান যুদ্ধ শেষ না হলে বাজেট ও যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে বড় সংঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে। দেশের ভেতরে ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতিতে আরও আগ্রাসী ও অনিশ্চিত আচরণ করতে পারেন বলেও সতর্ক করেছেন বিশ্লেষক।
রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও ফাটল দেখা দিতে পারে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিংবা রন ডিস্যান্টিসের মতো নেতারা ‘ট্রাম্প-পরবর্তী’ রিপাবলিকান রাজনীতির নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসতে পারেন।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পকে কিছুটা নমনীয় শোনা গেছে। তিনি বলেন, ‘দেশের জন্য সবকিছু যাতে ভালোভাবে চলে, সে জন্য আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব।’ তবে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে ব্যালটে ছিলেন না; থাকলে বিপুল ব্যবধানে জিততেন। অথচ নির্বাচনের দুই দিন আগেই আইওয়ার এক সমাবেশে তিনি সমর্থকদের বলেছিলেন, ‘মনে করুন, আমিই ব্যালটে আছি।’
ডেমোক্র্যাটদের জন্যও ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করিয়ে দিয়েছে সিএনএন। প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতার কারণে তাদের ক্ষমতা সীমিত থাকবে, আর জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ব্যর্থ হলে দুই বছর পর তারাও ভোটারদের সমর্থন হারাতে পারে। বিশ্লেষণের শেষে কলিনসন লিখেছেন, ‘কোনো প্রেসিডেন্ট, নিজেকে যত শক্তিশালীই ভাবুন না কেন, অজেয় নন।’
তথ্যসূত্র: সিএনএন
ছবি: সংগৃহীত