Columbus | ১৮ আগস্ট, ২০২৬ | ২ ভাদ্র, ১৪৩৩
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে জাতীয় সংসদের দেয়ালে কালেমা তাইয়্যেবা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধস, অনুমোদন নেমে ৩৩ শতাংশে অরুণাচল সীমান্তে চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ, ফের উত্তপ্ত ভারত–চীন সম্পর্ক ধীরে ধীরে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে: নাহিদ ইসলাম ‘আওয়ামী লীগ কোনো দিনই পরিবর্তন হবে না’: ডা. সায়মা আফরোজ কয়েকটি রাস্তা-ব্রিজ বানিয়ে দেশ বানানোর দাবি নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক উন্নয়ন: তারেক রহমান দোয়া ও স্মৃতিচারণে বাফেলোতে খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় ইলিয়াস কাঞ্চন, দেড় বছর পর দেশে ফিরে আবার লন্ডনে ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদের পথে বাধা, প্রার্থিতা ঠেকাতে ফিফার কাছে ফেয়ারস্কয়ারের চিঠি দুদকে নতুন নেতৃত্ব: চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান খায়রুল হকের দেশত্যাগে আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অবসান, জাতীয় স্বার্থই এখন অগ্রাধিকার’: মাহদী আমিন চীনা বাজারে নতুন কৌশল, আলিবাবার সহায়তায় নিজস্ব এআই মডেল বানাচ্ছে অ্যাপল ইরান ইস্যু ও কিমের সঙ্গে সম্পর্ক: দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মহড়া কমালেন ট্রাম্প রাজধানীতে কাল থেকে পিংক বাস, চালক-কন্ডাক্টরও নারী
হোম জাতীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে জাতীয় সংসদের দেয়ালে কালেমা তাইয়্যেবা

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে জাতীয় সংসদের দেয়ালে কালেমা তাইয়্যেবা

নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৩:১৮ এএম, ১৮ আগস্ট, ২০২৬ 24
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে জাতীয় সংসদের দেয়ালে কালেমা তাইয়্যেবা

ঢাকা ||

জাতীয় সংসদ ভবনে ধর্মীয় প্রতীক ও রাষ্ট্রীয় নীতির নতুন কিছু সংযোজন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিএনপির ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক পোস্টের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরামর্শে জাতীয় সংসদের স্পিকারের আসনের ঠিক পেছনের দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সংসদ ভবনের প্রবেশদ্বারগুলোতে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’—এই মূলনীতিও খোদাই করে সংযোজন করা হয়েছে বলে পোস্টটিতে দাবি করা হয়।


বিএনপির ওই পোস্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের ১৩তম অধিবেশন শুরুর আগে এসব সংযোজন করা হয়। অর্থাৎ বিষয়টি হঠাৎ করে চলতি অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নয়; বরং সংসদের নতুন অধিবেশন শুরুর আগেই এগুলো স্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।


সংসদের স্পিকারের আসনের পেছনে কালেমা

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংসদ কক্ষের স্পিকারের আসনের ঠিক পেছনের দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে কালেমা তাইয়্যেবা স্থাপন করা হয়েছে। এতে লেখা হয়েছে—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’।


ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে পরিচিত এই কালেমা। জাতীয় সংসদের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এমন ধর্মীয় ক্যালিগ্রাফি স্থাপনের বিষয়টি তাই প্রতীকী ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।


প্রবেশদ্বারে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’

শুধু সংসদ কক্ষের দেয়ালেই নয়, সংসদ ভবনের প্রবেশদ্বারগুলোতেও ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটি সংযোজন করা হয়েছে বলে বিএনপির পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।


এই ভাষাটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সংবিধানের বর্তমান পাঠে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির অংশ হিসেবে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’-এর উল্লেখ রয়েছে—যদিও একই সঙ্গে সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নীতিও রয়েছে।


তবে এই বিষয়টির সাংবিধানিক ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও বিতর্কপূর্ণ। বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে চার মূলনীতির একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। পরবর্তী সময়ে সংবিধানের পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ যুক্ত হয়। পরবর্তীকালে সাংবিধানিক পরিবর্তনের ধারায় ধর্মনিরপেক্ষতাও আবার মৌলিক নীতির অংশ হিসেবে ফিরে আসে।


বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিল

জাতীয় সংসদে এই সংযোজনের বিষয়টি বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।


২০২৫ সালের নভেম্বরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, দল ক্ষমতায় গেলে সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিতে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন করা হবে।


এর আগে বিএনপির নির্বাচনী বক্তব্যেও তারেক রহমান বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান সংবিধানে ‘absolute trust and faith in Almighty Allah’ যুক্ত করেছিলেন এবং বিএনপি ক্ষমতায় এলে তা পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই বক্তব্যে তিনি ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা বলেন এবং বলেন—ধর্ম ব্যক্তির, রাষ্ট্র সবার।


ফলে সংসদ ভবনে কালেমা ও ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ সংযোজনকে বিএনপির বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অবস্থানের প্রতীকী প্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।


ধর্ম ও রাষ্ট্র—আবারও আলোচনায়

জাতীয় সংসদে কালেমা তাইয়্যেবা স্থাপনের ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনতে পারে।


একদিকে দেশের বিপুলসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয়টি রয়েছে। অন্যদিকে সংসদ হলো রাষ্ট্রের সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান—মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ও ধর্মবিশ্বাসহীন নাগরিক সবার।


বাংলাদেশের সংবিধানও একদিকে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির অংশ হিসেবে রেখেছে এবং নাগরিকদের ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনার জন্ম দেওয়া স্বাভাবিক।


প্রতীকী পরিবর্তন, নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা?


রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দিক থেকে দেখলে, জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কালেমা তাইয়্যেবা স্থাপন কেবল একটি স্থাপত্যগত সংযোজন নয়—এটি সরকারের মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক দর্শনের একটি প্রতীকী বার্তাও বহন করতে পারে।


বিশেষ করে বিএনপির নেতৃত্ব অতীতে সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের নীতি পুনঃস্থাপনের কথা বলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে সংসদ ভবনে একই ধরনের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতীক যুক্ত করার ঘটনাকে দলের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।


তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংসদ ভবনে এসব সংযোজনের তথ্যের প্রাথমিক সূত্র হিসেবে যে তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে, সেটি বিএনপির ফেসবুক পেজের পোস্ট। এখন পর্যন্ত আমাদের পাওয়া প্রতিবেদনে আলাদা কোনো সংসদ সচিবালয় বিজ্ঞপ্তি বা সরকারি নথি উদ্ধৃত হয়নি। তাই ঘটনাটিকে সংবাদে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই সূত্রগত বিষয়টি স্পষ্ট রাখা জরুরি।


নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি


সব মিলিয়ে, জাতীয় সংসদের স্পিকারের আসনের পেছনে কালেমা তাইয়্যেবা এবং প্রবেশদ্বারে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ সংযোজন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতীকের ব্যবহার, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে নতুন আলোচনার দ্বার খুলেছে।


এটি একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতীকী সম্পর্ককে সামনে আনছে; অন্যদিকে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।


অতএব, জাতীয় সংসদের দেয়ালে কালেমা তাইয়্যেবা স্থাপনের ঘটনাটি শুধু একটি নতুন ক্যালিগ্রাফি সংযোজন নয়—বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র, ধর্ম এবং জাতীয় পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কেরও একটি দৃশ্যমান প্রতীক।