‘আওয়ামী লীগ কোনো দিনই পরিবর্তন হবে না’: ডা. সায়মা আফরোজ
ঢাকা: আওয়ামী লীগকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘পরিবর্তন’, ‘সংস্কার’ কিংবা নতুন রূপে ফিরে আসার আলোচনা যখন নতুন করে সামনে এসেছে, তখন দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন ডা. সায়মা আফরোজ। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাঁর বক্তব্যের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে—“আওয়ামী লীগ কোনো দিনই পরিবর্তন হবে না”। ভিডিওটির সঙ্গে তাঁর নাম হিসেবে Dr. Sayma Afroz উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই বক্তব্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পুরো প্রেক্ষাপটটি বোঝা কঠিন। প্রকাশ্য সংবাদ প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, ডা. সায়মা আফরোজ দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য ও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় প্রকাশ্য অবস্থান
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন সায়মা আফরোজ ইভা। ওই সময় ভোটারদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বিকল্প নেই এবং নজরুল ইসলাম বাবুরও বিকল্প নেই—এমন বক্তব্য দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। একই প্রচারণায় আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এর আগেও ২০১৮ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে মাঠে সক্রিয়ভাবে দেখা গেছে। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে তাঁর উপস্থিতির কথাও উল্লেখ রয়েছে।
২০২৩ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা
২০২৩ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ডা. সায়মা আফরোজ ইভাকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি আড়াইহাজারের বিভিন্ন এলাকায় নৌকার পক্ষে ভোট চান এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রচারণায় অংশ নেন।
এ নিয়ে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়। কারণ, তিনি সে সময় সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং সরকারি কর্মচারীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ নিয়ে আচরণবিধির প্রশ্ন ওঠে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ডা. সায়মা আফরোজ ইভাকে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবুর স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও গণমাধ্যমগুলো তাঁকে এ পরিচয়েই উল্লেখ করেছে।
দৈনিক ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের নির্বাচনের সময় তাঁর স্বামীর পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে আসে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যের তাৎপর্য কী?
ইত্তেফাকের প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁর বক্তব্যের সারকথা হিসেবে সরাসরি বলা হয়েছে, “আওয়ামী লীগ কোনো দিনই পরিবর্তন হবে না।” অর্থাৎ দলটির চরিত্র বা রাজনৈতিক অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে—এমন সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দিয়েছেন বলেই বক্তব্যটির শিরোনাম থেকে প্রতীয়মান হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনলাইনে পাওয়া ইত্তেফাকের ভিডিওটির পূর্ণ বক্তব্যের নির্ভরযোগ্য লিখিত ট্রান্সক্রিপ্ট পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর কথার নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা, তিনি ‘পরিবর্তন’ বলতে নেতৃত্ব, আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো নাকি অন্য কোনো বিষয় বোঝাতে চেয়েছেন—তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
অতীত বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান মন্তব্যের যোগসূত্র
প্রকাশ্য তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডা. সায়মা আফরোজের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। ২০১৮ সালে তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন; ২০২৩ সালেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন।
সেই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের ‘পরিবর্তন’ নিয়ে তাঁর বর্তমান মন্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির ভবিষ্যৎ, সংস্কার ও নতুন রূপে রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার মধ্যেই তাঁর এই মন্তব্য সামনে এসেছে।
অন্যদিকে তাঁর আগের আওয়ামী লীগপন্থী প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন রয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক মন্তব্যটি তাঁর পূর্ববর্তী প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের আলোকে আলোচনায় আসা স্বাভাবিক।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ডা. সায়মা আফরোজের সাম্প্রতিক মন্তব্যটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য সংস্কার নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে একটি স্পষ্ট অবস্থান হিসেবে সামনে এসেছে। তবে বক্তব্যটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট না পাওয়া পর্যন্ত এর বাইরে কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তাঁর নামে আরোপ করা উচিত হবে না।