আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর
নিজস্ব প্রতিনিধি ||
সাক্ষরতা এখন আর শুধু পড়তে, লিখতে ও গণনা করতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—ডিজিটাল দক্ষতা, তথ্য-সচেতনতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, জীবনদক্ষতা ও পরিবেশ সচেতনতাকেও আধুনিক সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
আগামীকাল মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে পালিত হবে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ২০২৬ সালের দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘Literacy for People, the Planet and Prosperity’—বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা। এ বছর দিবসটি পালনের ৬০ বছর পূর্তিও হচ্ছে।
সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায়
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তায় বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সাক্ষরতার ধারণাকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। সরকারের লক্ষ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে শুধু সনদ অর্জনকেন্দ্রিক না রেখে দক্ষতাভিত্তিক, কর্মসংস্থানমুখী ও নৈতিক শিক্ষার দিকে এগিয়ে নেওয়া।
তিনি সাক্ষরতা কর্মসূচির সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রযুক্তি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সংযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারী এবং গৃহিণীদের স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন ও ডিজিটাল সাক্ষরতার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সাক্ষরতার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র
প্রধানমন্ত্রীর মতে, সাক্ষরতা শুধু নিরক্ষরতা দূর করার কর্মসূচি নয়; এটি মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবেও কাজ করে।
তিনি শিশু, নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস সামনে রেখে সোমবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এই তথ্য ২০২৫ সালের অর্থনৈতিক জরিপের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, সাক্ষরতার হার ৭৭ শতাংশের বেশি হওয়া অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো মৌলিক শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
তিনি জানান, ঝরে পড়া শিশু, কিশোর-কিশোরী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্কদের দ্রুত সাক্ষর ও দক্ষ করে তোলা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
বাস্তব দক্ষতার ওপর গুরুত্ব
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় ‘Effective Literacy and Practical Skills Training’ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্কের (BNQF) মানদণ্ড অনুযায়ী উত্তীর্ণ হয়েছে।
তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন—অর্থাৎ প্রায় ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ—স্থায়ী কর্মসংস্থান, শোভন কাজের শিক্ষানবিশি বা নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে ‘Adult and Functional Literacy for Ability Enhancement Programme (ALFA)’ গ্রহণের কথাও জানানো হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সাক্ষরতার নতুন সংজ্ঞা
UNESCO-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক আয়োজন ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর মেক্সিকোর চিয়াপাসে অনুষ্ঠিত হবে।
UNESCO বলছে, ২০২৪ সালেও বিশ্বে অন্তত ৭৩৯ মিলিয়ন তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৌলিক সাক্ষরতা দক্ষতার ঘাটতি ছিল। একই সঙ্গে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক শিশু ন্যূনতম পাঠদক্ষতার মান অর্জন করতে পারছে না।
ফলে পরিবর্তিত প্রযুক্তি ও কর্মবাজারের বাস্তবতায় শুধু পড়তে ও লিখতে পারার পাশাপাশি তথ্য যাচাই, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, বিশ্লেষণী চিন্তা এবং বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনও এখন সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সেই বিস্তৃত ধারণাকেই সামনে আনা হচ্ছে—যেখানে সাক্ষরতা হবে ব্যক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।