আটকের পর আইনি প্রক্রিয়াই হবে সুরক্ষার ঢাল, ২৪ ঘণ্টার পর গোপন আটক নিয়ে কঠোর বার্তা
ঢাকা প্রতিনিধি:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক কোনো ব্যক্তিকে নির্ধারিত সময়ের পরও গোপনে আটকে রাখা এবং তার আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাউকে আটকের পর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হলে এবং তার অবস্থান বা আটকের বিষয়টি গোপন রাখা হলে, ওই অতিরিক্ত সময় গুমের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি এসব বিষয় তুলে ধরেন। এর আগে রোববার জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ পাস হয়। নতুন আইনে গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এর প্রতিকার ও বিচারের পথকে আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুধু একজন ব্যক্তিকে আটক করাই বিষয়টির শেষ নয়; আটকের পর তার অবস্থান কোথায়, তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, পরিবারের কাছে তার বিষয়ে তথ্য দেওয়া হচ্ছে কি না এবং তিনি আইনি সুবিধা পাচ্ছেন কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিকে অজ্ঞাত বা গোপন স্থানে রাখা, তার আটকের তথ্য গোপন করা কিংবা তাকে আইনগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হলে সেটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নতুন আইনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, আগে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বিষয়ে অধ্যাদেশ থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি। নতুন আইন ভুক্তভোগী ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের জন্য বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আরও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে অতীতে সংঘটিত গুমের অভিযোগগুলোও নতুন আইনের আলোকে পর্যালোচনা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তবে প্রতিটি দীর্ঘ সময়ের আটক ঘটনাকে একইভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো গুমের ঘটনা ব্যাপক বা পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এমন বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এর বিচার হতে পারে। অন্যদিকে, ব্যাপক বা পদ্ধতিগত অপরাধের আওতায় না পড়া গুমের ঘটনাকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সংশ্লিষ্ট আদালতে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
আইনটি কার্যকর হওয়ার ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আটক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আটক ব্যক্তির আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির অবস্থান গোপন করে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার অভিযোগ উঠলে সেটি আর শুধু সাধারণ আটক হিসেবে দেখার সুযোগ থাকবে না—ঘটনার প্রকৃতি ও আইনের শর্ত অনুযায়ী তা গুমের অভিযোগ হিসেবে তদন্ত ও বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
নতুন আইনের এই ব্যাখ্যাকে দেশের মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন চিফ প্রসিকিউটর। তাঁর মতে, আইনটির মাধ্যমে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছে।