তেলের সংকটের আড়ালে ‘মুখের তেল’—শফিকুর রহমানের কটাক্ষে তোষামোদ রাজনীতির প্রশ্ন
ঢাকা প্রতিনিধি:
দেশে চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনার সময় ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় তোষামোদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দেশে তেলের সংকট চললেও ‘মুখের তেল’ বন্ধ হলে তেলের সংকট থাকবে না। তাঁর এই বক্তব্যে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ক্ষমতাকেন্দ্রিক তোষামোদ ও বাস্তবতা আড়াল করার রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে শফিকুর রহমান এ মন্তব্য করেন। আলোচনাটি ছিল তাঁর উত্থাপিত একটি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ওপর।
‘মুখের তেল’ বলতে শফিকুর রহমান মূলত তোষামোদ বা চাটুকারিতাকে বোঝান। তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল—ক্ষমতাসীনদের চারপাশে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হলে, যেখানে বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে প্রশংসা বেশি গুরুত্ব পায়, সেখানে সরকারের কাছে দেশের প্রকৃত সংকটের চিত্র যথাযথভাবে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে তিনি জ্বালানি সংকটের আলোচনার সঙ্গে রাজনৈতিক তোষামোদ বন্ধের প্রয়োজনীয়তাকেও যুক্ত করেছেন।
শফিকুর রহমান একই আলোচনায় সংসদে দেওয়া সরকারি আশ্বাস এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্যের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, মিটার ও ডিমান্ড চার্জ না নেওয়ার মতো কিছু বিষয়ে সংসদে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। একইভাবে বিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে বিল’ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে ভালো পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে না।
বিদ্যুৎ সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি নিজের সাম্প্রতিক লংমার্চের অভিজ্ঞতার কথাও বলেন। বিভিন্ন জেলা ও বাজারে থামার সময় বিদ্যুতের ঘাটতি দেখেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের একটি বড় অংশের মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। তাঁর ভাষায়, একটি দেশ যখন বিদ্যুৎ সংকটে পড়ে, তখন দেশ ‘পাওয়ারলেস’ হয়ে যায়। তিনি চান বাংলাদেশ একটি ‘পাওয়ারফুল’ জাতি হিসেবে এগিয়ে যাক।
তবে শফিকুর রহমানের বক্তব্য শুধু সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাবও দেন। তাঁর ভাষ্য, সরকার চাইলে বিরোধী দলের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমকে সরকারের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। সংকট সমাধানে কে কৃতিত্ব নেবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়—দেশের স্বার্থে সমাধান করাই প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে সরকার বলছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য অর্থ বরাদ্দের কথাও সংসদে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে শফিকুর রহমানের ‘মুখের তেল’ মন্তব্যটি কেবল একটি রসিকতাপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এর মধ্য দিয়ে তিনি তোষামোদনির্ভর রাজনীতির বদলে বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার, জবাবদিহিতা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে সরকারের প্রতি সমালোচনার পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার প্রস্তাবও রয়েছে। ফলে জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক জ্বালানি-বিদ্যুৎ বিতর্কে মন্তব্যটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গের পাশাপাশি সরকারের কর্মদক্ষতা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি নিয়ে একটি বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে।