বিমানবন্দরে বিতর্কিত ঘটনার মামলায় হাইকোর্টে জামিন পেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্ব পালনরত এক নিরাপত্তাকর্মীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে করা মামলায় জামিন পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান। রোববার (১ নভেম্বর) হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
একই সঙ্গে তাঁকে স্থায়ী জামিন দেওয়া হবে না কেন, তা জানতে চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রতি রুল জারি করেছেন আদালত। ফলে এই আদেশকে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর আইনজীবী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানিয়েছেন, হাইকোর্টের আদেশের পর কারাগার থেকে তাঁর মুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
মামলার সূত্রপাত গত ১ অক্টোবর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেদিন সৌদি আরবের মদিনা থেকে বাংলাদেশে ফেরেন জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। তাঁদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে আসা যাত্রীরা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর লাগেজ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন।
সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইটটি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরে যাত্রীরা ইমিগ্রেশন শেষে লাগেজ সংগ্রহের জন্য ৮ নম্বর বেল্ট এলাকায় যান। কিন্তু যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় লাগেজ সংগ্রহের ট্রলি নিয়ে সাময়িক সংকট তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, এ সময় জামায়াত নেতাদের কয়েকজন প্রটোকল সহকারী সারির নিয়ম না মেনে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। অন্যদিকে লাগেজ পেতে দেরি এবং জমজমের পানি না পাওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েকজন যাত্রী উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ ঘটনাস্থলে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তাঁর সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন এবং তাঁকে হুমকি দেন।
নিরাপত্তাকর্মীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ
মামলার বিবরণে আরও বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের সংরক্ষিত নিরাপত্তা এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাঁদের ভিডিও ধারণ বন্ধ করতে বলেন।
এ ঘটনায় আখতারুজ্জামান ক্ষুব্ধ হয়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ফেলে দেওয়ার এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত। আদালতে এগুলো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
২ অক্টোবর গ্রেপ্তার, পরদিন রিমান্ড
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, নিরাপত্তাকর্মীকে আঘাত ও হুমকি দেওয়াসহ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
এরপর ২ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টের ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করে। শুনানি শেষে আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ৪ অক্টোবর তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে তাঁর আইনজীবীরা জামিন আবেদন করেন। কিন্তু আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
জামিন শুনানি ঘিরে আদালতপাড়ায় উত্তেজনা
মামলাটি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা দেখা যায়।
প্রথম দফায় জামিন শুনানির সময় দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা, ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিচারক কিছু সময়ের জন্য এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবার শুনানি শুরু হয়।
২৬ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতেও তাঁর জামিন আবেদন খারিজ হয়। অর্থাৎ নিম্ন আদালতে দুই দফা জামিন না পাওয়ার পর তাঁর আইনজীবীরা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন।
অবশেষে হাইকোর্টে জামিন
নিম্ন আদালতে জামিন না পাওয়ার পর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মাধ্যমে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন আখতারুজ্জামান। রোববার ১ নভেম্বর সেই আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন।
আদালত একই সঙ্গে স্থায়ী জামিনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে রুল জারি করেছেন। ফলে মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকবে। আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের আদেশের পর তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে আইনগত বাধা নেই। তবে মুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি আলাদা।
বিএনপি থেকে জামায়াতে যোগদান, রাজনৈতিক পরিচয়েও আলোচনা
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিএনপির মনোনয়নে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর গত বছরের ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাঁর এই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
একজন সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে তাঁর গ্রেপ্তার ও জামিনের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লাগেজ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টিও এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে। যাত্রীদের অভিযোগ ও বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংঘাতের অভিযোগ আলাদা আইনি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিমানবন্দরের একটি ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা থেকে শুরু হওয়া ঘটনা শেষ পর্যন্ত মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় গড়ায়। নিম্ন আদালতে দুই দফা জামিন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেলেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। তবে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।