মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে।
সকালে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করেন। পরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে মিরপুর-১১, মিরপুর-১২ এবং প্রশিকা মোড়সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। এতে ওই অঞ্চলের সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কর্মস্থলগামী মানুষ, যাত্রী ও সাধারণ পথচারীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান বেতনে বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য খরচ বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এতে পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, সকাল থেকেই মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর বাইরের শিল্পাঞ্চলেও। গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় পোশাকশ্রমিকেরা বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেন। কোনাবাড়ী এলাকায় একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তবে গাজীপুরের এই ঘটনাকে মিরপুরের সংঘর্ষ থেকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়া ও গাজীপুরের বেশ কিছু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। মিরপুরের অনেক কারখানাও কার্যক্রম চালাতে পারেনি। গত কয়েক দিনের বিক্ষোভ ও অবরোধের কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানিয়েছেন। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে শ্রমিকদের দাবি, নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ শুধু শ্রমিক ও কারখানা মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা—দুই বিষয়ই এখন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।