চার দশক পর জাতিসংঘের শীর্ষ মঞ্চে বাংলাদেশ, সভাপতির দায়িত্ব নিলেন খলিলুর রহমান
নিউইয়র্ক প্রতিনিধি:
দীর্ঘ চার দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসলেন বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিয়ে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এর মধ্য দিয়ে আগামী এক বছর জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যবিশিষ্ট সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন তিনি।
শপথ গ্রহণের সময় খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সনদ ও সভাপতির দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা মেনে সততা, নিষ্ঠা ও বিবেকের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো সরকার বা বাইরের কোনো পক্ষের নির্দেশনা গ্রহণ না করে জাতিসংঘের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
এর আগে চলতি বছরের ২ জুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন খলিলুর রহমান। গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করেন। কাকোরিস পেয়েছিলেন ৯১ ভোট। এবারের সভাপতি পদটি জাতিসংঘের আঞ্চলিক পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থায় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল।
খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাজনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। প্রায় ৪০ বছর পর আবারও একজন বাংলাদেশি একই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, খলিলুর রহমান সে সময় হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
নতুন দায়িত্বের শুরুতেই খলিলুর রহমান জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎ উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা, মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা, শরণার্থী ও অভিবাসীদের সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল শাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কার।
এবারের দায়িত্বের সময়কালও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। একই সময়ে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনও এই মেয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হবে।
খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণ তাই শুধু ব্যক্তিগত বা কূটনৈতিক অর্জন নয়; এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ও কূটনৈতিক সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। আগামী এক বছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা, বিভিন্ন দেশের মতপার্থক্যের মধ্যে সমন্বয় তৈরি এবং বৈশ্বিক ইস্যুতে বহুপাক্ষিক আলোচনার পরিবেশ ধরে রাখায় তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ (United Nations).