জ্যামাইকায় তৃতীয় বাংলা স্কুল চালু করল বাংলাদেশ সোসাইটি, প্রবাসী শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষায় নতুন অধ্যায়
যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যে নিউইয়র্কের জ্যামাইকা, কুইন্সে তৃতীয় বাংলা স্কুল চালু করেছে বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকরপোরেশন। প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারের সন্তানদের মাতৃভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানো এবং তাঁদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে সংগঠনটির এই উদ্যোগকে কমিউনিটির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৬ অক্টোবর প্রকাশিত Bangla Bulletin-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২ অক্টোবর শুক্রবার স্কুলটির নতুন শাখার উদ্বোধন করা হয়। জ্যামাইকার ৮৭-৪১, ১৬৫তম স্ট্রিটে অবস্থিত Elhaam Academy-তে এই শাখাটি চালু করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সদস্য, অভিভাবক এবং কমিউনিটির প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বাংলাদেশ সোসাইটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারের নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ানোই এই স্কুলের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা ছোটবেলায় যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসা অনেক শিশু দৈনন্দিন জীবনে ইংরেজি ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। স্কুল, বন্ধু, সামাজিক পরিবেশ এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে ইংরেজির ব্যবহার বেশি থাকায় অনেক শিশুর বাংলা বলা, পড়া ও লেখার দক্ষতা সীমিত থেকে যায়।
এ অবস্থায় মাতৃভাষা শেখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন কমিউনিটির নেতারা। বাংলা ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশুদের বাংলা শেখার সুযোগ তৈরি হলে তারা বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আরও সহজে যোগাযোগ করতে পারবে এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কেও সচেতন হতে পারবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অভিবাসী কমিউনিটি ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ভাষাও ধরে রাখার চেষ্টা করে। চীনা, মেক্সিকান, ইহুদি ও হিস্পানিক পরিবারের উদাহরণ তুলে ধরে তাঁরা বলেন, মাতৃভাষা শেখাকে কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি নতুন প্রজন্মের পরিচয়, পারিবারিক বন্ধন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
বাংলাদেশ সোসাইটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন শাখাটি চালুর মাধ্যমে সংগঠনটি বাংলা ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চা আরও বিস্তৃত করতে চায়। সংগঠনটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির একটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও এই উদ্যোগকে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন স্কুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সোসাইটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন দেওয়ান, ভাইস প্রেসিডেন্ট কামরুজ্জামান কামরুল, স্কুল ও শিক্ষা সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান জিলানী, প্রচার সম্পাদক রিজু মোহাম্মদ এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদক অনিক রাজসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য আহসান হাবিব, ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার ও আজিমুর রহমান বোরহানসহ কমিউনিটির আরও কয়েকজন প্রতিনিধিও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বাংলাদেশ সোসাইটির আগে থেকেই ব্রুকলিন ও কুইন্সে দুটি বাংলা স্কুল পরিচালনার কার্যক্রম ছিল। জ্যামাইকায় নতুন শাখা চালুর ফলে সংগঠনটির বাংলা স্কুলের সংখ্যা দাঁড়াল তিনটিতে। এতে কুইন্সের জ্যামাইকা ও আশপাশের এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর সন্তানদের জন্য বাংলা শেখার নতুন সুযোগ তৈরি হলো।
তবে একটি বাংলা স্কুলের দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য শুধু উদ্বোধনই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত পাঠদান, শিশুদের বয়স অনুযায়ী পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক, বই ও শিক্ষাসামগ্রী এবং অভিভাবকদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য বাংলা শেখার পদ্ধতি আনন্দদায়ক ও ব্যবহারিক করা গেলে তাদের আগ্রহ ধরে রাখা সহজ হবে।
প্রবাসে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ বাংলাদেশি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক যত শক্তিশালী হবে, ততই তারা নিজেদের পারিবারিক ইতিহাস এবং বাংলাদেশের শিকড় সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
তথ্যসূত্র: Bangla Bulletin, ৬ অক্টোবর ২০২৬; Bangladesh Society Inc-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের তথ্য।