বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনায়
ঢাকা প্রতিনিধি ||
আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের নতুন পথ হিসেবে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। প্রাথমিকভাবে এই বন্ডের আকার ৫০০ মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে এই বন্ড ছাড়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতদিন বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিভিন্ন উন্নয়ন ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্ডের চূড়ান্ত আকার ৫০০ মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন ডলারের মধ্যে নির্ধারণ করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, বাজার পরিস্থিতি, সুদের হার এবং সরকারের প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে শেষ পর্যন্ত কত অর্থ সংগ্রহ করা হবে, সেটি নির্ধারণ করা হবে।
বন্ডটি পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্যুর প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগানকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি হংকংভিত্তিক ব্রিজওয়ার্কস ইন্টারন্যাশনালকে কারিগরি সহায়তার জন্য যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো ইতোমধ্যে নীতিগত অনুমোদনের পর্যায় অতিক্রম করেছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করার কথা রয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে দেশের বাজেট ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংকনির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এর একটি অংশ ব্যাংকঋণের মাধ্যমে পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি করতে পারে। এ কারণে সার্বভৌম বন্ড, সুকুক এবং বহুপক্ষীয় সংস্থার অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিকল্প উৎসের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম বন্ড সফলভাবে ইস্যু হলে ভবিষ্যতে দেশের জন্য বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ঋণবাজারের একটি মূল্যায়ন বা বেঞ্চমার্কও তৈরি হবে।
তবে বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিময় হার ও সুদের হারের ঝুঁকিও রয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে গেলে ডলারে নেওয়া ঋণের স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে। ফলে বন্ডের আকার, সুদের হার, মেয়াদ এবং অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্র চূড়ান্ত করার সময় এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
এখন পর্যন্ত এটি সরকারের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। বন্ডের চূড়ান্ত আকার, সুদের হার, মেয়াদ এবং কোন বাজারে এটি ইস্যু করা হবে—এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পরই বিস্তারিত জানা যাবে।