Columbus, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিজ্ঞাপন 728 × 90
সর্বশেষ খবর
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জামায়াতের ৫০ লাখ টাকা অনুদান ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের, হরমুজ ঘিরে উত্তেজনায় আবারও বাড়ল তেলের দাম সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা: তিনজন কারাগারে, হামলার কারণ নিয়ে তদন্ত অব্যাহত হাম-জাতীয় উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু, বাংলাদেশে মোট মৃত্যু ১ হাজার ৯৯ মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুর: পুলিশ পাহারায় ফের শুরু টিকাদান, তদন্তে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ চা পাতা চুরিতে বাঁধা দেয়ায় হামলায় আহত পাহারাদার; চা বাগানের ক্ষুব্দ শ্রমিকদের প্রতিবাদ সভা কমলগঞ্জে অভয় চরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে সততা স্টোরের উদ্বোধন ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ঘুষ-দুর্নীতি, মাদক-মব ও চাঁদাবাজির দাপট: উন্নয়নের পথে অদৃশ্য শিকল নোয়াখালীতে প্রথম কমিউনিটি কাবাডি টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত শ্রমিক ধর্মঘটে নওগাঁয় ২য় দিনে অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল বন্ধ; ভোগান্তিতে যাত্রীরা দ্বিতীয় দফায় নওগাঁয় নতুন করে নিয়োগ পেলেন ৬১ জন কুড়িগ্রামে তথ্য অধিকার দিবসের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি’ কুড়িগ্রাম সীমান্তে ১৬ লাখ টাকার মাদক ও চোরাচালানী মালামাল জব্দ পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারে নেই কাঙ্খিত উন্নয়ন বিশ্ব পর্যটন দিবসে দুর্গাপুরের অপার সম্ভাবনাময় পর্যটনকে বিকশিত করার আহ্বান
হোম › বিশেষ প্রতিবেদন › ঘুষ-দুর্নীতি, মাদক-মব ও চাঁদাবাজির দাপট: উন্নয়নের পথে অদৃশ্য শিকল

ঘুষ-দুর্নীতি, মাদক-মব ও চাঁদাবাজির দাপট: উন্নয়নের পথে অদৃশ্য শিকল

নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৮:১০ এএম, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 2
ঘুষ-দুর্নীতি, মাদক-মব ও চাঁদাবাজির দাপট: উন্নয়নের পথে অদৃশ্য শিকল

মোহাম্মদ উল্যা

নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি॥


ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক, মব ও চাঁদাবাজি; শুধু সামাজিক ব্যাধি নয়; এগুলো একটি রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রযাত্রার পথে নীরব অথচ ভয়ংকর প্রতিবন্ধকতা।


উন্নয়নের কথা বলা হয়, বড় বড় প্রকল্পের কথা বলা হয়, রাস্তা-ঘাট, সেতু, ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের হিসাব দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা কতটা এগিয়েছে? নাগরিক তার ন্যায্য সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হলে, ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির চাপে থাকলে, তরুণ মাদকের ছোবলে বিপথগামী হলে কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে জনতা বিচার করতে শুরু করলে সেই সমাজকে কি সত্যিকার অর্থে উন্নত বলা যায়?


বাস্তবতা হলো, উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু সবসময় দৃশ্যমান হয় না। কখনো তা ঘুষের খামে, কখনো দুর্নীতির ফাইলে, কখনো মাদকের প্যাকেটে, কখনো চাঁদাবাজির দাবিতে, আবার কখনো উত্তেজিত জনতার হাতে প্রকাশ পায়। এসব অনিয়ম ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানুষের পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করে দেয়।


ঘুষ একটি নাগরিক অধিকারকে অনুগ্রহে পরিণত করে। যে সেবা একজন নাগরিকের আইনগত অধিকার, সেটি পেতে যদি তাকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, তাহলে সেখানে শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সেবাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা। ঘুষের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে যোগ্যতার চেয়ে অর্থ ও প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয় এবং অন্যায় ধীরে ধীরে নিয়মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।


দুর্নীতির ক্ষতি আরও গভীর। রাষ্ট্রীয় অর্থ, জনসম্পদ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে জনগণের জীবনে। একটি নিম্নমানের রাস্তা, একটি অসম্পূর্ণ অবকাঠামো, একটি অকার্যকর প্রকল্প কিংবা প্রয়োজনীয় সেবার ঘাটতির পেছনে অর্থের অপচয় ও অনিয়ম থাকলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়। দুর্নীতি তাই শুধু অর্থ আত্মসাতের বিষয় নয়; এটি নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর আঘাত।


অন্যদিকে মাদক একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে পারে। একটি তরুণ যখন মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষতি শুধু তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবারে নেমে আসে অশান্তি, অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক দুর্ভোগ। মাদককে কেন্দ্র করে অপরাধ ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই মাদক প্রতিরোধকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে শিক্ষা, পরিবার, কর্মসংস্থান, সামাজিক মূল্যবোধ ও সচেতনতার বিষয়ও গভীরভাবে জড়িত।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মব-তৎপরতার ভয়াবহ প্রবণতা। অভিযোগ উঠলেই তদন্ত, প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করে জনতার হাতে শাস্তি তুলে দেওয়া কোনো সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। অভিযোগ সত্য হলে আইনানুগ বিচার প্রয়োজন, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষা আরও বেশি প্রয়োজন। বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, উত্তেজনার ভিত্তিতে নয়।


চাঁদাবাজিও একটি সুস্থ অর্থনৈতিক পরিবেশের জন্য বড় বাধা। ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর অবৈধ অর্থের চাপ তৈরি হলে ব্যবসার ব্যয় বাড়ে, বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সংকুচিত হতে পারে। চাঁদাবাজির সংস্কৃতি কোনো এলাকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায় না; বরং মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।


সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সমস্যাগুলো অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। দুর্নীতি দুর্বল করে প্রতিষ্ঠানকে, দুর্বল প্রতিষ্ঠান তৈরি করে অনিয়মের সুযোগ, অনিয়ম বাড়ায় মানুষের হতাশা, হতাশা কখনো উসকে দেয় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। অন্যদিকে মাদক ও চাঁদাবাজি সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে সেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।


তাই উন্নয়নের প্রকৃত সংজ্ঞা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে নাগরিক ঘুষ ছাড়াই সেবা পাবেন, ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির ভয় ছাড়াই ব্যবসা করবেন, তরুণ মাদকের সহজলভ্যতা থেকে সুরক্ষিত থাকবে এবং কোনো অপরাধের বিচার জনতার হাতে নয়, আইনের মাধ্যমে হবে।


এ জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন, জবাবদিহি, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। গণমাধ্যমকেও গুজব, উত্তেজনা ও যাচাইহীন তথ্যের পরিবর্তে সত্য, প্রমাণ ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।


পরিবর্তন শুধু আইন দিয়ে আসে না; পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। ঘুষ না দেওয়া, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, মাদককে সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনসম্মতভাবে অবস্থান নেওয়া এবং মব-তৎপরতার পরিবর্তে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখা—এসব নাগরিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।


কারণ একটি রাস্তা নির্মাণ করা উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু সেই রাস্তায় মানুষ নিরাপদে চলতে না পারলে উন্নয়নের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু সেখানে সেবা পেতে ঘুষ দিতে হলে সেই উন্নয়ন প্রশ্নের মুখে পড়ে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যদি মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নও অসম্পূর্ণ।


ঘুষ দুর্নীতি, মাদক, মব ও চাঁদা—উন্নয়নের পথে চরম বাধা।

এই বাধা শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি নৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক।


আজ প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে ক্ষমতা হবে দায়িত্বের নাম, অর্থ হবে সেবার মাধ্যম—অন্যায় সুবিধার হাতিয়ার নয়; যেখানে বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, প্রভাবের মাধ্যমে নয়; যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থে নয়।


উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন উন্নয়নের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে সততা, ন্যায়, নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও মানবিক মর্যাদা।


ঘুষের খাম, দুর্নীতির ফাইল, মাদকের প্যাকেট, চাঁদাবাজির দাবি আর মবের উন্মত্ততা—এসবের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।


কারণ উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু রাস্তার বাধা সরালেই হবে না; সমাজের ভেতরে গড়ে ওঠা অন্যায়ের অদৃশ্য শিকলও ছিন্ন করতে হবে।