আসক্তির সংস্কৃতি নয়, কর্মের সংস্কৃতিই গড়তে পারে উন্নত জাতি
একটি জাতির উন্নতি শুধু বড় বড় ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে নির্ধারিত হয় না। জাতির প্রকৃত উন্নতি নির্ভর করে মানুষের নৈতিকতা, কর্মসংস্কৃতি, দায়িত্ববোধ, সততা ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর। যে সমাজে উৎপাদনশীলতার চেয়ে অপচয়, পরিশ্রমের চেয়ে পরনির্ভরতা এবং নৈতিক উপার্জনের চেয়ে অনৈতিক আয়ের আকাঙ্ক্ষা বেশি হয়ে ওঠে, সে সমাজের ভিত ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে।
আজ আমাদের আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। যে জাতি আসলের চেয়ে সুদে, মধুর চেয়ে মদে এবং শ্রমের চেয়ে সহজ উপার্জনে বেশি আকৃষ্ট হয়, সেই জাতির সামনে উন্নয়নের পথ যতই প্রশস্ত হোক, কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন। সুদ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে; আর মাদক ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও সুস্থ জীবনযাপনকে সামাজিক অগ্রাধিকারে পরিণত করা জরুরি।
আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো যোগ্যতা ও কর্মীর পরিবর্তে প্রভাবশালী মাস্তান বা শক্তির প্রদর্শনকে গুরুত্ব দেওয়া। যে সমাজে সাধারণ নাগরিকের অধিকার, সৎ কর্মীর মর্যাদা ও যোগ্যতার চেয়ে ভয় দেখানোর ক্ষমতা বেশি মূল্য পায়, সেখানে আইনের শাসন ও সামাজিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শক্তিশালী সমাজের পরিচয় অস্ত্র বা পেশিশক্তি নয়; বরং ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, দক্ষতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় যখন কর্মের মর্যাদা কমে যায় এবং অনৈতিক আয়কে সাফল্যের সহজ পথ হিসেবে দেখা শুরু হয়। ভিক্ষা, অনুদান বা সহায়তা প্রকৃত অসহায় মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা হতে পারে; কিন্তু সক্ষম মানুষকে কর্মবিমুখ করে তোলা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, তেমনি নাগরিকের দায়িত্ব হলো শ্রম, দক্ষতা ও সততার মাধ্যমে নিজের অবস্থান গড়ে তোলা।
একটি সুস্থ জাতির সন্তান জানবে—শ্রম লজ্জার নয়, অলসতা লজ্জার; সৎ আয় ছোট নয়, অসৎ আয়ই কলঙ্কের; যোগ্যতা দুর্বলতা নয়, আর পেশিশক্তি নেতৃত্বের বিকল্প নয়।
আমাদের পরিবারকে সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার শিক্ষা দিলে হবে না; তাকে সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা শেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান না হয়ে মূল্যবোধ গঠনের কেন্দ্র হতে হবে। সমাজকে শ্রমজীবী মানুষকে সম্মান করতে হবে এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও সততার মূল্য বাড়াতে হবে।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নাগরিকের চিন্তায় পরিবর্তন আসে। রাস্তা-ঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নৈতিক ও কর্মগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না।
তাই প্রশ্নটি শুধু—আমরা কতটা উন্নত হয়েছি?
প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমাদের মূল্যবোধ কতটা উন্নত হয়েছে?
যে জাতি মাদককে না বলে কর্মকে বেছে নেয়,
পরনির্ভরতাকে না বলে দক্ষতাকে গ্রহণ করে,
মাস্তানিকে না বলে আইনের শাসনকে প্রতিষ্ঠা করে,
অনৈতিক আয়কে না বলে সৎ উপার্জনকে মর্যাদা দেয়;
সেই জাতির উন্নয়ন কেবল স্বপ্ন থাকে না, বাস্তব শক্তিতে পরিণত হয়।
জাতি বদলাতে হলে প্রথমে বদলাতে হবে মানসিকতা। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে আজ, আমাদের প্রত্যেকের নিজের ঘর, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ থেকে।
মোহাম্মদ উল্যা
নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি