শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত, ‘আইনি প্রক্রিয়াতেই’ হবে সিদ্ধান্ত
ঢাকা প্রতিনিধি॥
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নয়াদিল্লি বলছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে একটি ‘আইনি বিষয়’ এবং নির্ধারিত আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘প্রত্যর্পণের বিষয়টি যতদূর সংশ্লিষ্ট, এটি একটি আইনি বিষয়। এর সঙ্গে আইনি বিষয়গুলো জড়িত রয়েছে।’
সাংবাদিকরা জানতে চান, শেখ হাসিনার বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথিপত্র বাংলাদেশ ভারতের কাছে পাঠিয়েছে কি না এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু করতে এসব নথি প্রয়োজন কি না। জয়সওয়াল এ বিষয়ে সরাসরি কোনো তথ্য না দিয়ে আবারও বলেন, প্রত্যর্পণের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর আগে জুলাই মাসেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। সে সময় জয়সওয়াল বলেছিলেন, প্রত্যর্পণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ভারতের প্রচলিত আইন এবং দুই দেশের বিদ্যমান চুক্তির বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অক্টোবরের শুরুতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও শেখ হাসিনার ফেরার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বিষয়টি একটি কাঠামোবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে এবং আদালতসহ সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যবস্থার বিষয়টি এখানে রয়েছে। ফলে কবে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
ভারতের এই বক্তব্যের ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার প্রত্যাশিত সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানানো হচ্ছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লি এখনো প্রকাশ্যে তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়সীমা ঘোষণা করেনি।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। তার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের নতুন সরকার তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয় সামনে এনে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানায়।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে শেখ হাসিনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন এবং তার পক্ষ থেকে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে দাবি করা হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে আছে। তার ভারতে অবস্থান এবং ঢাকার প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে মন্তব্য করার পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়েও ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পারস্পরিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই ভারতের বর্তমান অবস্থানের মূল ভিত্তি।
এর আগে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাওয়ার পর বিষয়টি প্রচলিত আইনি কাঠামোর আওতায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে সেই পর্যালোচনার ফলাফল বা শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
ফলে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত ভারতের অবস্থান হলো—বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। তবে সেই প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে বা শেষ পর্যন্ত প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত কী হবে, সে বিষয়ে নয়াদিল্লি এখনো কোনো সময়সীমা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।