ক্ষমতার পালাবদলের পর বিএনপির চারপাশে নতুন মুখ
পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন বলয়ে কারা? তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর ঘিরে নতুন করে আলোচনায় রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন?
মো: নাজমুল হাসান বাবু,
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন॥
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর কভার করতে গিয়ে আরেকটি বিষয়ও আমার চোখে পড়েছে। বিএনপির দীর্ঘদিনের পরিচিত নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচিতে এমন কিছু নতুন মুখও দেখা যাচ্ছে, যাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে এখন আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এসেছেন তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে, কেউ জাতিসংঘের সামনে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে, কেউ হোটেলের সামনে অপেক্ষা করেছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের নতুন রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই নতুন মুখগুলো কারা এবং তাদের রাজনৈতিক অতীত কী?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দল পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক মানুষ তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেন। কেউ আদর্শগত কারণে একটি দল ছেড়ে অন্য দলে যান, কেউ দীর্ঘদিন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বেছে নেন, আবার কেউ ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করেন। তাই শুধু কোনো ব্যক্তি নতুন করে বিএনপির কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়েছেন বলেই তাকে সুযোগসন্ধানী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
কিন্তু তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর নতুন করে এই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে এবং তারেক রহমান সরকারপ্রধান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে সফর করেছেন। ফলে তার সঙ্গে একটি ছবি, একটি সাক্ষাৎ, একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিতি কিংবা তার কাছাকাছি অবস্থান করার বিষয়টি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। এখান থেকেই শুরু হয়েছে নতুন মুখদের নিয়ে আলোচনা।
এই জায়গায় একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বলা দরকার। কারও আওয়ামী লীগের কোনো নেতার সঙ্গে ছবি থাকলেই তাকে আওয়ামী লীগের নেতা বলা যায় না। কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলেও সেটি দলীয় পরিচয়ের প্রমাণ নয়। আবার কোনো ব্যক্তি অতীতে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন—এমন তথ্য থাকলেও তিনি বর্তমানে বিএনপির রাজনীতি করছেন কি না, সেটি আলাদা করে যাচাই করতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পুরোনো দলীয় পদ, কমিটির তালিকা, নির্বাচনী ভূমিকা, প্রকাশ্য বক্তব্য, দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং বর্তমান দলের আনুষ্ঠানিক পরিচয়—এসব তথ্য একসঙ্গে যাচাই করেই কোনো সিদ্ধান্তে আসতে হয়।
তবে প্রশ্নটি একেবারে অমূলক নয়। ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক দলগুলোর চারপাশে নতুন মানুষের উপস্থিতি বাড়তে পারে। যে দল দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে ছিল, তারা ক্ষমতায় এলে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং যোগাযোগের পরিধি বাড়ে। তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেক নতুন মানুষ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার আগ্রহ দেখাতে পারেন। বিএনপির ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর এই পরিবর্তনকে আরও দৃশ্যমান করেছে। বিভিন্ন স্টেট থেকে বিএনপি নেতাকর্মীরা নিউইয়র্কে এসে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। দলীয় সমন্বয়ের জন্য বিভিন্ন স্টেট ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। হোটেলের সামনে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করার জন্যও বিপুলসংখ্যক মানুষ অপেক্ষা করেছেন। এই ভিড়ের মধ্যে পুরোনো নেতাদের পাশাপাশি নতুনদের উপস্থিতি থাকাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু কে সত্যিকার অর্থে নতুন, কে দীর্ঘদিনের কর্মী, আর কে সম্প্রতি রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করেছেন—এগুলো আলাদা করে খুঁজে দেখা দরকার।
এখানেই বিএনপির পুরোনো নেতাকর্মীদের একটি সম্ভাব্য প্রশ্ন সামনে আসে। যারা দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে ছিলেন, বিরোধী অবস্থানে থাকার সময় রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থেকেছেন এবং কঠিন সময়ে দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন, তারা যদি দেখেন ক্ষমতায় আসার পর নতুন নতুন মানুষ এসে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন, তাহলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই অসন্তোষ শুধু বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, যেকোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে নতুন যারা রাজনৈতিকভাবে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হতে চান, তাদেরও একটি যুক্তি রয়েছে। রাজনৈতিক মত পরিবর্তনের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে। একজন ব্যক্তি যদি সত্যিই আগের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে বিএনপির আদর্শ ও রাজনীতি গ্রহণ করেন, তাহলে তাকে শুধু অতীতের কারণে চিরদিনের জন্য বাদ দেওয়ারও যুক্তি নেই। একটি রাজনৈতিক দল নতুন মানুষকে গ্রহণ করেই বড় হয়। তাই নতুন মুখ আসা নিজেই কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়।
সমস্যা তৈরি হয় অন্য জায়গায়। যদি কেউ নিজের রাজনৈতিক অতীত গোপন করেন, যদি পূর্বের পরিচয় সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করেন, অথবা শুধু ক্ষমতাসীন দলের কাছাকাছি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করেন—তাহলে সেই বিষয়টি অবশ্যই জনআলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু সেটি প্রমাণ করতে হবে। অনুমান দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে।
এখানে বিএনপির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক প্রশ্ন রয়েছে। দলটি যদি নতুন মানুষকে গ্রহণ করে, তাহলে তাদের রাজনৈতিক অতীত যাচাই করার কোনো প্রক্রিয়া আছে কি না। একজন নতুন ব্যক্তি কোন রাজনৈতিক সংগঠনে ছিলেন, কখন ছিলেন, কী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কেন রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছেন—এসব তথ্য প্রকাশ্য থাকলে দলের পুরোনো কর্মীদের মধ্যেও আস্থা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নতুনদের নিয়েও অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ কমবে।
রাজনৈতিক স্বচ্ছতার দিক থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি সত্যিই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে থাকেন এবং পরে বিএনপিতে যোগ দেন, তাহলে সেটি লুকানোর প্রয়োজন নেই। বরং প্রকাশ্যভাবে বলা যেতে পারে যে তিনি আগে একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছিলেন এবং এখন বিএনপির রাজনীতি করছেন। রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নিজে কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ইতিহাস জনগণের সামনে পরিষ্কার থাকা দরকার।
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকে কেন্দ্র করে তাই শুধু কে কত লোক নিয়ে বিমানবন্দরে গেলেন বা কে হোটেলের সামনে দাঁড়ালেন, সেটি দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি দেখতে হবে কারা নতুন করে রাজনৈতিক বলয়ে প্রবেশ করছেন, তাদের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় কী, তারা কখন অবস্থান পরিবর্তন করেছেন এবং বর্তমান বিএনপিতে তাদের ভূমিকা কী।
এই অনুসন্ধান আরও গভীরে নিতে হলে ব্যক্তিভিত্তিকভাবে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। পুরোনো দলীয় কমিটি, নির্বাচনী নথি, সংবাদপত্রের আর্কাইভ, পুরোনো ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকাশ্য পোস্ট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের বক্তব্য—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব। তখন বোঝা যাবে কে সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছেন, কে নতুন করে বিএনপির রাজনীতিতে এসেছেন এবং কার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে কি না।
আমার চোখে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিএনপির সামনে এখন পুরোনো ও নতুন—দুই ধরনের রাজনৈতিক শক্তিকে একসঙ্গে পরিচালনা করার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের কর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং ত্যাগকে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি নতুন মানুষকে জায়গা দিতে হবে। কিন্তু সেই জায়গা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে দলের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। আবার নতুন মানুষকে শুধু তাদের অতীতের কারণে প্রত্যাখ্যান করলেও দল নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর তাই এই প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে—ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে কি শুধু সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, নাকি রাজনৈতিক বলয়ের চরিত্রও বদলাতে শুরু করেছে? নতুন মানুষদের উপস্থিতি কি বিএনপির রাজনৈতিক সম্প্রসারণের স্বাভাবিক অংশ, নাকি এর মধ্যে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কাজ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে অনুসন্ধান এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত প্রকৃত অনুসন্ধান। কে ছিলেন কোথায়, কখন বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হলেন, তার আগের রাজনৈতিক ভূমিকা কী ছিল এবং বর্তমানে তার দায়িত্ব কী—এসব তথ্য একে একে সামনে আনলেই মানুষ নিজেরাই পুরো ছবিটা বুঝতে পারবেন।
কারণ রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করা একজন নাগরিকের অধিকার হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের ইতিহাসও জনজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আর সেই ইতিহাসকে যাচাই করে মানুষের সামনে তুলে ধরাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ।