পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারে নেই কাঙ্খিত উন্নয়ন
মাহিদুল ইসলাম,
মৌলভীবাজার॥
দেশের অন্যতম পর্যটন জেলা
মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার দেড়যুগ পার হলেও এখনও তেমন কোন কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। পর্যটনকে চিন্তা করে বেসরকারি ভাবে রিসোর্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জেলায় গড়ে উঠলেও সরকারি ভাবে তেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে এ জেলাকে ঘিরে পর্যটনের অপার সম্ভবনা থাকলেও সরকারি ভাবে কাঙ্খিত উন্নয়ন ও উদ্যোগ না থাকায় তা কাজে আসছে না।

জানা যায়, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন জেলা হচ্ছে মৌলভীবাজার। এ জেলার সাতটি উপজেলায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক ছোট-বড় মিলে প্রায় শতাধিক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে অসংখ্য চা বাগান, রিসোর্ট ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। গত একদশকে বেসরকারিভাবে পর্যটন খাতে কিছুটা উন্নতি ঘটলেও সরকারি ভাবে এ খাতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পর্যটন জেলা হিসেবে মৌলভীবাজারকে ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ এই সময়ে যতটুকু পর্যটন সমৃদ্ধ জেলা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সরকারি ভাবে। জেলায় ছোট-বড় অনেক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এসব পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পর্যটনকেন্দ্র ছাড়া অনেক পর্যটন কেন্দ্রে সরকারি নজর পড়েনি এখনও।
পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেছেন, পর্যটন জেলা ঘোষণার পর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হলেও পর্যটন শিল্পের বিকাশে দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন হয়নি। বেসরকারিভাবে আধুনিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠলেও সিজন ছাড়া বছরের অন্য সময় পর্যটক কম আসায় অনেক ব্যবসায়ী হতাশায় ভুগছেন। পর্যটককে সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে এখানকার পর্যটনকেন্দ্রগুলো নতুন করে সাজানো, অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, বিমানে যাতায়াতের ব্যবস্থা, ট্রেনের টিকিট বৃদ্ধি, পর্যটকদের সুরক্ষা, উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে দেশ ও দেশের বাহিরে এখানের দর্শনীয় স্থান নিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। তবেই কিছুটা হলেও সংকট দূর হবে একই সাথে পর্যটক শিল্প বিকশিত হবে। তবে অবাকের বিষয় হচ্ছে জেলার পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি ভাবে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়না।
সরেজমিনে খুঁজ নিয়ে জানা যায়, গেল কয়েকবছর ধরে জেলায় পর্যটন শিল্পের কথা চিন্তা করে বেসরকারী ভাবে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠলেও পর্যটন শিল্পের সামগ্রিক তেমন বিকাশ হয়নি। কারন সরকারিভাবে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নান্দনিক কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রিসোর্ট, হোটেল ব্যবসার মাধ্যমে ব্যাক্তি উদ্যোগে অনেকই এগিয়ে এসেছেন। তবে সরকারি ভাবে ছোট পরিসরে কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রে টুকটাক কিছু কাজ করলেও বড় পরিসরে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রে জেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার একেবারে উন্নয়ন হয়নি। যাতায়াতের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন বাহন নেই। এ জেলায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ হলে চাকরি ও কর্মসংস্থান কয়েকগুণ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার পর্যটন শিল্পের উপর জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। এতে করে পর্যটন ব্যবসায় স্বল্প পরিসরে হলে অর্থনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যাক্তি ও পরিবার পর্যায়ে। সরকারি ভাবে পর্যটন শিল্প এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করলে আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতো।
দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরতে আসা জারা রহমান, আবিদ হাসান, সাকিব চৌধুরী বলেন, এখানকার পরিবেশ আবহাওয়া চমৎকার। একবার কেউ আসলে বারবার আসতে চাইবেন। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে নানান সমস্যায় জর্জরিত এই পর্যটন এলাকা। রেলপথ ও সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই বাজে। সরকারি ভাবে পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়না। পর্যটকদের জন্য শ্রীমঙ্গল ও জেলা শহর ছাড়া ভালো খাবারের ব্যাবস্থা নাই বললেই চলে। স্থানীয় ভাবে পর্যটকদের জন্য বিশেষ বাস বা গাড়ীর ব্যবস্থা নেই।
শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টের পরিচালক নয়ন আহমেদ বলেন, এ জেলার পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি ভাবে মিউজিয়ামসহ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান নতুনভাবে আবিষ্কার করলে আরও অনেকদূর এগিয়ে যাবে এ জেলার পর্যটন শিল্প। এই শিল্প এগিয়ে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বেশ প্রভাব ফেলবে। পর্যটনকে ঘিরে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটন খাত এগিয়ে গেলে আরও কর্মসংস্থান বাড়বে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ বলেন, জেলায় পর্যটনকে কেন্দ্র করে ব্যাক্তি উদ্যোগে শুধু রিসোর্টের সংখ্যাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি ভাবে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া খুবই প্রয়োজন। বিশেষ করে যাতায়াত ব্যবস্থার অবস্থা খুবই নাজুক। এছাড়া বিদেশি পর্যটকেরা এই অঞ্চলে ঘুরতে আসলে সুযোগ সুবিধা খুবই কম পেয়ে থাকেন। পর্যটন নিয়ে ব্যাপক কাজ করলে দেশের পাশাপাশি বিদেশিরা পর্যটক হিসেবে আসবেন এই জেলায়।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মিউজিয়াম, শিশু পার্ক স্থাপনসহ বেশকিছু দাবী জানানো হয়েছে। প্রতিটি দাবী বাস্তবায়নের জন্য অর্থের প্রয়োজন। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব পর্যটনের উন্নয়নের ততটুকু কাজ করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজারে আসলে যেসব স্থান ঘুরে দেখতে পারেন এগুলো হচ্ছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, উঁচু নিচু সবুজ চা বাগান, মাধবপুর লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল, হামহাম জলপ্রপাত, মণিপুরী পল্লি, খাসিয়া পুঞ্জি, হাকালুকি হাওর, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নীলকণ্ঠ টি কেবিন, সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, পৃথিমপাশা নবাববাড়ি, পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট, বর্ষিজোড়া ইকোপার্কসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান।