সোনাইমুড়ীতে ‘মব’ তৈরির অভিযোগে দুই কিশোর গ্রেপ্তার, ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি
মোহাম্মদ উল্যা
নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে মাদকসেবী অপবাদ দিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে রিকশাচালক মো. ফয়েজ আহাম্মদকে (৪৩) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তারের পর তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
রোববার (৪ অক্টোবর) বিকেলে নোয়াখালীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আতিক উল্লাহর আদালতে তাদের জবানবন্দি নেওয়া হয়। গ্রেপ্তার দুই কিশোর হলো সোনাইমুড়ী উপজেলার শাকতলা গ্রামের আশ্রাফুল ইসলাম শ্রাবন (১৬) ও আকবর হোসেন ফাহিম (১৭)। পিবিআইয়ের ভাষ্য, তারা নিজ এলাকা ও আশপাশের এলাকার কিশোরদের নিয়ে একটি দল গড়ে তুলেছিল। ওই দল এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি, অরাজকতা এবং ‘মব’ তৈরির মাধ্যমে জনশান্তি বিঘ্নিত করে আসছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুন রাত ১১টা থেকে ১২ জুন রাত ১টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে সোনাইমুড়ী উপজেলার শাকতলা ছিদ্দিকিয়া আলিয়া মাদ্রাসার পূর্ব পাশে এবং পরে নদোনা আছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন সড়কে ফয়েজ আহাম্মদের ওপর হামলা চালানো হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পূর্বশত্রুতার জেরে ফয়েজকে মাদকসেবী হিসেবে অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে লোকজন জড়ো করা হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্ত কিশোর ও তাদের সহযোগীরা লাঠিসোঁটা ও রড দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় তারা।
পরে স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় ফয়েজকে উদ্ধার করে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ১২ জুন সোনাইমুড়ী থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় সবুজ (২২), মনা (২৫) ও জামাল (২৬)সহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় সংস্থাটি স্বউদ্যোগে তদন্তের দায়িত্ব নেয়। পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক ফরিদ উদ্দিনকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়।
পিবিআই জানায়, এক মাসের বেশি সময় ধরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নথিপত্র পর্যালোচনা, ঘটনাস্থল বিশ্লেষণ ও নিবিড় তদন্তের পাশাপাশি কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় রোববার ভোর পৌনে ৩টার দিকে শাকতলা গ্রামে অভিযান চালিয়ে এজাহারবহির্ভূত ও তদন্তে উঠে আসা ওই দুই কিশোরকে আইনি হেফাজতে নেওয়া হয়।
পিবিআইয়ের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। পরে বিকেল ৩টার দিকে তাদের আদালতে হাজির করা হলে দুজনই ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
তদন্তে পিবিআই আরও জানতে পেরেছে, গ্রেপ্তার দুই কিশোরের নেতৃত্বে একটি কিশোর দল গড়ে উঠেছিল। ওই দলের সদস্যরা বিভিন্ন সময় এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ত্রাস সৃষ্টি এবং ‘মব’ তৈরির মাধ্যমে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করত বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার দিন মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে ফয়েজের সঙ্গে ওই কিশোর ও তাদের সহযোগীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে লাঠিসোঁটা ও রড দিয়ে তাকে মারধর করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
নোয়াখালী পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার আর এম ফয়জুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না এবং ‘মব’ তৈরির পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছিল, সেসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।