তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর শেষে বিএনপির ভেতরের চিত্র
উচ্ছ্বাসের আড়ালে দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের টানাপোড়েন ও সংগঠনের সমন্বয়হীনতার প্রশ্ন
মো: নাজমুল হাসান বাবু,
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন॥
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর শেষ হয়ে গেছে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে দেশের পথে রওনা হয়েছেন। কিন্তু তার সফরকে ঘিরে নিউইয়র্কে গত কয়েকদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যে ব্যাপক তৎপরতা, উচ্ছ্বাস, প্রতিযোগিতা ও নানা ধরনের টানাপোড়েন দেখা গেছে, সফর শেষ হওয়ার পরও সেই ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা থামেনি। বরং এখন পুরো ঘটনাটিকে একটু দূর থেকে দেখলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—তারেক রহমানকে ঘিরে যে বিপুল রাজনৈতিক উচ্ছ্বাস দেখা গেল, তার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাংগঠনিক বাস্তবতা আসলে কেমন?
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক আগমনকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল। JFK বিমানবন্দর থেকে শুরু করে ম্যানহাটনের হোটেল, জ্যাকসন হাইটস এবং জাতিসংঘের আশপাশে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন স্টেট ও অঙ্গসংগঠন থেকে নেতাকর্মীরা নিউইয়র্কে এসে কর্মসূচিতে অংশ নেন। দলীয় পক্ষ থেকেও বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা এবং জাতিসংঘের সামনে স্বাগত সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই ব্যাপক তৎপরতার কথা উঠে এসেছে।
কিন্তু মাঠের চিত্র শুধু উচ্ছ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাওয়া, তার কাছাকাছি যাওয়া, একটি ছবি তোলা কিংবা নিজেদের সংগঠনের উপস্থিতি দৃশ্যমান করার জন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে যে আগ্রহ দেখা গেছে, সেটি একপর্যায়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতার চেহারা নেয়। বিশেষ করে ম্যানহাটনের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের সামনে কয়েকদিন ধরে নেতাকর্মীদের যে ভিড় দেখা গেছে, সেখানে এই বাস্তবতাটি খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দূর-দূরান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন শাখার নেতাকর্মীরা হোটেলের সামনে এসে অপেক্ষা করেন। কারও প্রত্যাশা ছিল কয়েক মিনিটের জন্য হলেও তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করা, কারও লক্ষ্য ছিল একটি ছবি তোলা। বিভিন্ন স্টেটের নেতাদেরও সেখানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। এই বিপুল উপস্থিতি একদিকে তারেক রহমানের প্রতি নেতাকর্মীদের আগ্রহ ও রাজনৈতিক আবেগের প্রকাশ হলেও, অন্যদিকে এত মানুষের প্রত্যাশা সামলানো এবং তাদের মধ্যে সমন্বয় করাটাও আয়োজকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
২৫ সেপ্টেম্বর গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের সামনে সেই ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ্যে আসে। উপস্থিত অনেক নেতাকর্মী সাক্ষাৎ আয়োজনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে দেখা করার সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশের সদস্যদের ঘটনাস্থলে এসে নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাতে হয়। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে এই ঘটনাকে শুধু বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখলেও পুরো বাস্তবতা ধরা পড়বে না। কারণ একই সময়ে বিএনপির নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলীয় পর্যায়ে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা বা মান-অভিমান থাকলেও তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, দলের ভেতরে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই সফরের সময় সবাই একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ একই ঘটনার মধ্যে যেমন সাংগঠনিক টানাপোড়েনের চিত্র রয়েছে, তেমনি বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টাও রয়েছে।
আর এখানেই এসে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির দীর্ঘদিনের আরেকটি প্রশ্ন—কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাঠামো। তারেক রহমানের সফরের আগেই প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি নেই। বিভিন্ন স্টেট, মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের কমিটি থাকলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে স্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। দলীয় নেতাদের বক্তব্যেও এই বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির ১৭টি স্টেটভিত্তিক সংগঠন থাকার কথা দলীয় নেতারা জানিয়েছেন। নিউইয়র্কে একাধিক কমিটি রয়েছে, পাশাপাশি ওয়াশিংটন, ভার্জিনিয়া, মিশিগানসহ বিভিন্ন স্টেটেও বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। এতগুলো সংগঠন ও নেতাকর্মীকে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে সমন্বয় করা না গেলে বড় কর্মসূচির সময় নেতৃত্ব ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তারেক রহমানের সফরের সময় কেন্দ্র থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন নেতাকে বিভিন্ন স্টেট ও অঙ্গসংগঠনের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে সফরটি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের রাজনৈতিক উপস্থিতির মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সাময়িক সমন্বয় আর স্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামো এক জিনিস নয়। প্রশ্ন থেকে যায়—প্রতিটি বড় কর্মসূচির আগে এভাবে সমন্বয় করে কাজ চালানো হবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির জন্য একটি স্থায়ী কেন্দ্রীয় কাঠামো তৈরি করা হবে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও জড়িত। দীর্ঘদিন যারা যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির রাজনীতি করছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন যে তৃণমূল পর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করার পর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মূল্যায়নের সুযোগ থাকা দরকার। কেন্দ্রীয় কমিটি না থাকলে সেই রাজনৈতিক অগ্রগতির পথও অনিশ্চিত হয়ে যায়। ফলে সাংগঠনিক পদ-পদবি, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করা নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর সেই অসন্তোষকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং বলা যায়, সফরটি সংগঠনের ভেতরে থাকা প্রতিযোগিতা ও সমন্বয়ের প্রশ্নগুলোকে দৃশ্যমান করেছে। বড় রাজনৈতিক নেতার সফরকে কেন্দ্র করে প্রত্যেক সংগঠন নিজেদের শক্তি দেখাতে চাইবে, প্রত্যেক নেতা নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চাইবেন এবং প্রত্যেক কর্মী নেতার কাছাকাছি যেতে চাইবেন—এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা যদি সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে না থাকে, তখনই সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে এই সফরের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর নিউইয়র্কে উপস্থিতি দেখিয়েছে যে বিএনপির প্রবাসী নেটওয়ার্ক যথেষ্ট সক্রিয়। ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া, বোস্টন, ওয়াশিংটন, টেনেসি এবং কানাডার বিভিন্ন শাখার নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দলের প্রতি তাদের রাজনৈতিক আগ্রহ ও সাংগঠনিক সংযোগের বিষয়টি সামনে এনেছে। এত বড় একটি নেটওয়ার্ককে যদি একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় কাঠামোর মধ্যে আনা যায়, তাহলে সেটি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে।
কিন্তু এর জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সমন্বিত নেতৃত্ব। কে সিদ্ধান্ত নেবেন, কে দায়িত্ব দেবেন, কোন সংগঠন কোন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেবে এবং কোনো বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সফরের সময় কীভাবে নেতাকর্মীদের ব্যবস্থাপনা করা হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার কাঠামো প্রয়োজন। গ্র্যান্ড হায়াতের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো অন্তত এটুকু দেখিয়েছে যে শুধু বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী থাকা যথেষ্ট নয়; সেই শক্তিকে পরিচালনা করার জন্য শক্তিশালী সাংগঠনিক ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
তারেক রহমান এখন নিউইয়র্ক ছেড়ে দেশে ফিরে গেছেন। তার জাতিসংঘ সফর শেষ হয়েছে, কর্মসূচিগুলোও শেষ হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির জন্য সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়তো এখন শুরু। কারণ কয়েকদিনের উচ্ছ্বাস, মিছিল, স্বাগত কর্মসূচি কিংবা নেতার সঙ্গে ছবি—এসবের বাইরে এখন প্রশ্ন হলো, দলটি নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো কতটা শক্তিশালী করতে পারে।
সফরের সময় যে বিপুল রাজনৈতিক শক্তি নিউইয়র্কে দেখা গেছে, সেটি যদি নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রমে রূপান্তর করা যায়, তাহলে তারেক রহমানের সফর যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকতে পারে। আর যদি সফর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শক্তি আবার বিভিন্ন গ্রুপ, ব্যক্তি ও আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়, তাহলে কয়েকদিনের এই ব্যাপক উচ্ছ্বাস দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত নাও হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর শুধু একটি আন্তর্জাতিক সফরের ঘটনা ছিল না। এটি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির শক্তি, সমর্থন, নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য এবং সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতারও একটি দৃশ্যমান পরীক্ষা ছিল। একদিকে দেখা গেছে নেতার প্রতি বিপুল উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে দেখা গেছে সাক্ষাৎ ও উপস্থিতিকে ঘিরে প্রতিযোগিতা, ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ এবং দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রশ্ন। সফর শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন আর প্রশ্নটি তারেক রহমানকে নিয়ে নয়; প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিকে নিয়ে—এই বিপুল রাজনৈতিক শক্তিকে তারা কতটা সংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে।