অসদাচরণের অভিযোগে গ্রিসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগের নির্দেশ
ওয়াশিংটন প্রতিনিধি ||
অসদাচরণের একাধিক অভিযোগের পর গ্রিসে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছে হোয়াইট হাউস। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়া এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধে এক রাজনৈতিক দাতার কাছে এক লাখ ডলার চাওয়া এবং এর বিনিময়ে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবের অভিযোগসহ তাঁর কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের সময়কার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
তবে গিলফয়েল তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন। অভিযোগগুলোর সত্যতা ও প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তের বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হোয়াইট হাউসের ঘোষণা
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে নিজের প্রথম সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়া বলেন, প্রশাসন রাষ্ট্রদূত গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছে। একই সঙ্গে তিনি গিলফয়েলকে প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভকামনা জানান।
এর আগের দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, গিলফয়েলকে তাঁর পদ থেকে সরানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এ নিয়ে প্রশাসন সন্তুষ্ট নয়। সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো নিয়ে প্রশাসনের অসন্তোষের পরই পদত্যাগের অনুরোধের ঘোষণা আসে।
এক লাখ ডলারের বিল নিয়ে অভিযোগ
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সিনেটে রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁর নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার শুনানির আগে গিলফয়েল রিপাবলিকান দলের সমর্থক ও রাজনৈতিক দাতা এরিক ডিটার্সের কাছে তাঁর ১ লাখ ডলারের আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের অনুরোধ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডিটার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে গিলফয়েল তাঁকে ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এসব অভিযোগের পক্ষে হিসেবে ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, ডিটার্স ওই অর্থ পরিশোধ করেননি।
ডিটার্সের বক্তব্য ও প্রকাশিত বার্তার ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, অভিযোগের প্রতিটি দিক স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না। গিলফয়েলের আইনজীবীরা অর্থ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থের বিষয়টি রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়নের আগের সময়ের বক্তৃতা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পারিশ্রমিকসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের সময়ও প্রশ্ন
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত অর্থ লেনদেনেই সীমাবদ্ধ নয়। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর একাধিক প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে অনুচিত উপহার ও বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ, গ্রিসের এক কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়া এবং একটি গ্রিক নির্মাণ ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একজন লবিস্টকে ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এসব অভিযোগের ফলে রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। গিলফয়েলের আইনজীবীরা তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করেছেন। ব্যক্তিগত বিমান ও বিলাসবহুল ভ্রমণসংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রেও তাঁদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ভ্রমণের আগে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনা নিয়েছিলেন এবং প্রযোজ্য বিধি অনুসরণ করেছিলেন।
তদন্ত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় গিলফয়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে তদন্তের আনুষ্ঠানিক অবস্থা ও এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সব তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
কংগ্রেসের কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাও অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি পদে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক দাতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর যোগাযোগের স্বচ্ছতা।
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর আগে গিলফয়েলের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজের প্রশংসা করেছিলেন। অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলেও তিনি সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-গ্রিস সম্পর্কে সম্ভাব্য প্রভাব
গ্রিস উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটোর সদস্য এবং ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এ ধরনের অভিযোগ ও রাষ্ট্রদূত পরিবর্তনের ঘটনা কূটনৈতিক মহলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
গিলফয়েলের পদত্যাগের অনুরোধের পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন এবং তদন্তের ফল কী দাঁড়াবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের অগ্রগতি এবং মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তই এখন এ ঘটনার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।