ভিসা প্রার্থীদের জন্য মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা, প্রতারণা এড়াতে মানতে হবে নতুন নিয়ম
মোঃ নাজমুল হাসান বাবু॥
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে আগ্রহী বাংলাদেশি আবেদনকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। ভিসা আবেদন, সাক্ষাৎকার, ভিসা বন্ডের অর্থ পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর না করে শুধু মার্কিন সরকারের অনুমোদিত ব্যবস্থা অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে সেই দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে, যেসব দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে B1/B2 ভিসা ইস্যুর আগে ভিসা বন্ড দিতে হতে পারে। এই নিয়ম বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক B1 বা B2 ভিসার জন্য আবেদন করে অন্য সব দিক থেকে যোগ্য বিবেচিত হলে কনস্যুলার কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে ১০ হাজার, ১৫ হাজার অথবা ২০ হাজার মার্কিন ডলারের ভিসা বন্ড দিতে নির্দেশ দিতে পারেন। বন্ডের পরিমাণ আবেদনকারীর সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করা হয়।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ভিসা বন্ড দেওয়া মানেই ভিসা নিশ্চিত হওয়া নয়। কনস্যুলার কর্মকর্তা নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো আবেদনকারীকে বন্ডের অর্থ পরিশোধ করতে হবে না।
বন্ড দেওয়ার প্রয়োজন হলে আবেদনকারীকে মার্কিন সরকারের নির্ধারিত DHS Form I-352 পূরণ করতে হবে এবং অর্থ পরিশোধ করতে হবে মার্কিন সরকারের Pay.gov ব্যবস্থার মাধ্যমে। কনস্যুলার কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার পরই আবেদনকারীকে অর্থ পরিশোধের নির্দিষ্ট লিংক দেওয়া হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আরও সতর্ক করেছে, কনস্যুলার কর্মকর্তার নির্দেশনা ছাড়া কোনো ওয়েবসাইটে ভিসা বন্ডের অর্থ দেওয়া যাবে না। সরকারি ব্যবস্থার বাইরে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা দিলে সেই অর্থের জন্য মার্কিন সরকার দায়ী থাকবে না।
ভিসা বন্ডের পাশাপাশি ভিসা আবেদনকারীদের প্রতারণা থেকেও সতর্ক করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। ভিসা করে দেওয়ার নিশ্চয়তা, দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্ট, বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে ভিসা পাইয়ে দেওয়া কিংবা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের নামে অর্থ দাবি করা—এ ধরনের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ভিসা জালিয়াতি বা ভিসার অপব্যবহারের বিষয়ে তথ্য জানলে অনলাইনে তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন। এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন এনেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে নির্দিষ্ট আরও কয়েকটি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা শ্রেণির আবেদনকারীদের অনলাইন উপস্থিতি যাচাই বা online presence review-এর আওতায় আনা হয়েছে।
এর মধ্যে I ক্যাটাগরির বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং TN ও TD শ্রেণির আবেদনকারীরা রয়েছেন। এসব শ্রেণির আবেদনকারীদের ভিসা যাচাই প্রক্রিয়ার সুবিধার্থে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের গোপনীয়তা সেটিংস ‘public’ বা ‘open’ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী, এক্সচেঞ্জ ভিজিটর, ধর্মীয় কর্মী এবং কয়েকটি বিশেষ শ্রেণির ভিসা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও অনলাইন উপস্থিতি যাচাইয়ের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, ভিসা যাচাইয়ের সময় জাতীয় নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা এবং আবেদনকারীর ভিসার যোগ্যতা নির্ধারণে আইনসম্মতভাবে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য বিবেচনা করা হয়।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা কোনো অধিকার হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণের ভিত্তিতে সরকারের দেওয়া অনুমতি হিসেবে বিবেচিত হয়। আবেদনকারীকে যে ধরনের ভিসার জন্য আবেদন করছেন, সেই ভিসার শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও অবস্থানের প্রকৃত উদ্দেশ্যও বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে হয়।
ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো সাক্ষাৎকারের স্থান নির্ধারণের নিয়ম। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীদের সাধারণভাবে তাদের জাতীয়তা বা বৈধ বসবাসের দেশের মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সাক্ষাৎকারের জন্য আবেদন করা উচিত।
অন্য দেশে গিয়ে ভিসা সাক্ষাৎকার দেওয়ার চেষ্টা করলে আবেদনকারীর জন্য যোগ্যতা প্রমাণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে বলেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে। আবেদনকারী যদি বসবাসের দেশের ভিত্তিতে অন্য কোনো দেশে আবেদন করেন, তাহলে সেই দেশে তার বৈধ বসবাসের প্রমাণ দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ঢাকায় ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়াতেও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকারের আগে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রের মূল কপি ও কপি প্রস্তুত রাখতে হবে এবং CEAC অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করতে হবে।
ঢাকায় ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে দুই ধাপে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রথম ধাপে প্রয়োজনীয় নথি যাচাই, আঙুলের ছাপ ও ছবি সংগ্রহ করা হয়। নথিপত্র সম্পূর্ণ থাকলে একই সপ্তাহে দ্বিতীয় ধাপে কনস্যুলার কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় দেওয়া হতে পারে।
মার্কিন দূতাবাস আরও জানিয়েছে, ভিসা আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জন্মসনদ, পাসপোর্ট, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকের নথি এবং ভিসার ধরন অনুযায়ী অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে। কোনো নথি অসম্পূর্ণ থাকলে আবেদন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।
তবে সব কাগজপত্র জমা দিলেই ভিসা নিশ্চিত হয় না। মার্কিন দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী, কনস্যুলার কর্মকর্তা আবেদনপত্র ও সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। অতিরিক্ত কাগজপত্র প্রয়োজন হলে আবেদনকারীকে তা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। কিছু আবেদন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জন্যও অতিরিক্ত সময় নিতে পারে।
বাংলাদেশি ভিসা আবেদনকারীদের জন্য এসব পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভিসা বন্ডের নামে আগাম টাকা না দেওয়া, তৃতীয় পক্ষের প্রতিশ্রুতিতে ভরসা না করা, নির্ধারিত সরকারি ওয়েবসাইট ও পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যবহার করা এবং নিজের আবেদনসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনকারীকে তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আর্থিক সক্ষমতা এবং ভিসার শর্ত মেনে চলার বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দিতে হবে। কোনো তথ্য গোপন করা বা ভুল তথ্য দেওয়া ভবিষ্যতে ভিসা আবেদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভিসা প্রক্রিয়ায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনের কারণে আবেদনকারীদের এখন আরও বেশি সতর্কতার সঙ্গে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভিসা বন্ডের ক্ষেত্রে কনস্যুলার কর্মকর্তার সরাসরি নির্দেশনা ছাড়া কোনো অর্থ প্রদান না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
বাংলাদেশে মার্কিন ভিসা সংক্রান্ত সর্বশেষ নিয়ম, আবেদন প্রক্রিয়া, অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিষয়ে আবেদনকারীদের সরাসরি মার্কিন দূতাবাস ঢাকা ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (U.S. Department of State), U.S. Embassy Dhaka, Travel.State.Gov, মার্কিন দূতাবাস ঢাকার ভিসা নির্দেশনা এবং প্রকাশিত সরকারি নোটিশ।