ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা: হরমুজ প্রণালি খুলতে শর্ত, কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার
মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে নিউইয়র্কে নতুন করে আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জ্যারেড কুশনার মার্কিন পক্ষের হয়ে আলোচনায় অংশ নেন। ইরানের পক্ষে আলোচনায় ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার, পাকিস্তান ও মিসরের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং একটি সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ বন্ধের বিষয়গুলো আলোচনায় তোলা হয়েছে।
সর্বশেষ আলোচনায় ইরান একটি যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি ধাপে ধাপে পুনরায় খোলার প্রস্তাব দিয়েছে বলে আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওই প্রস্তাবে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের একটি আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব রয়েছে। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
এদিকে বুধবার হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওমানের নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হামলায় একজন ক্রু সদস্য নিহত হন এবং ২০ জনের বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি নিয়ে আলাদা তদন্ত চলছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ইরান আলোচনায় প্রস্তুত, তবে চাপ বা হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। তিনি ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকারও বজায় রাখার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি কার্যকর সমঝোতা নিশ্চিত করা এবং তেহরানের সামরিক ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের সমাধান করা।
পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল এখন আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরান প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়টিকে সামরিক চাপ কমানো ও অন্যান্য শর্তের সঙ্গে যুক্ত করছে।
তবে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান বলছে—আলোচনার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থের নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
নিউইয়র্কে নতুন করে যোগাযোগ শুরু হওয়ায় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও যুদ্ধবিরতি বা চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি। আগামী কয়েক দিনের আলোচনায় হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, যুদ্ধবিরতির শর্ত এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।