বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.২ শতাংশে নামাল আইএমএফ, মূল্যস্ফীতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ঢাকা প্রতিনিধি ||
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশে নামিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থবছরটিতে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও মূল্যস্ফীতির এই পূর্বাভাস দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আগের পূর্বাভাস থেকে বড় ধরনের অবনমন
১৩ অক্টোবর প্রকাশিত আইএমএফের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস জুলাইয়ে দেওয়া ৩.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.২ শতাংশ করা হয়েছে। এর আগে এপ্রিলের পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪.৩ শতাংশ ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ, সংস্থাটি কয়েক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেখছে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের পরিস্থিতি, বিনিয়োগের গতি, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে আইএমএফের পূর্বাভাসকে অর্থনীতির চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেখা যাবে না; এটি বিদ্যমান পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকির ভিত্তিতে তৈরি একটি প্রক্ষেপণ।
১০.৯ শতাংশে উঠতে পারে মূল্যস্ফীতি
প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশ হতে পারে। এপ্রিলে সংস্থাটির পূর্বাভাসে এই হার ৬ শতাংশ ধরা হয়েছিল।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে খাদ্য, পরিবহন, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি বাস্তবে কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতিগত পদক্ষেপের ওপর।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পূর্বাভাসের চেয়েও কম
আইএমএফের পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের মূল্যায়নের তুলনায় আরও সতর্ক চিত্র তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাংক ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-এ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছে। ফলে তিনটি প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসেই অর্থনৈতিক গতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কী প্রভাব পড়তে পারে
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেলে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে উৎপাদনশীল খাতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি খাতের দুর্বলতা, আর্থিক খাতের ঝুঁকি, রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগের দুর্বল গতি। এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে না পারলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত গতি ফেরানো কঠিন হতে পারে।
সামনে কী করণীয়
অর্থনীতির গতি বাড়াতে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও বেসরকারি খাতের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও প্রয়োজন।
আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির বাস্তব চিত্র নির্ভর করবে অর্থনৈতিক নীতি, বিনিয়োগের প্রবণতা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং সংস্কার কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।